হাওজা নিউজ এজেন্সি: ১৩ রজব হলো ইমামত ও বেলায়াতের প্রথম সূর্য, সাইয়্যেদুল আওসিয়া, মুজাহিদদের নেতা ও আবিদদের সরদার আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (আ.)–এর পবিত্র জন্মবার্ষিকী।
বিশিষ্ট আলেম শেখ মুফিদ (রহ.) (মৃত্যু: ৪১৩ হিজরি) তাঁর গ্রন্থ আল-ইরশাদ (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৫)-এ লিখেছেন— “রাসূলুল্লাহ (সা.)–এর পর তিনি মুমিনদের প্রথম ইমাম, মুসলমানদের শাসক এবং আল্লাহর দ্বীনের খলিফা। তাঁর কুনিয়াত আবুল হাসান। তিনি মক্কায়, পবিত্র কাবাঘরের অভ্যন্তরে, শুক্রবার ১৩ রজব, আমুল ফিলের ৩০ বছর পর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আগে ও পরে আর কেউ কাবাঘরে জন্মগ্রহণ করেননি—এটি তাঁর প্রতি আল্লাহর বিশেষ সম্মান। তাঁর মতো এত ফজিলত ও মর্যাদা আর কারও নেই; আর এটাই রাসূলের সকল সাহাবির ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের স্পষ্ট প্রমাণ।”
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) (মৃত্যু: ২৪১ হিজরি) বলেন— “সাহাবিদের মধ্যে আলী (আ.)–এর মতো এত অধিক ফজিলত আর কারও নেই।” (ফাযায়েলুস সাহাবা, পৃষ্ঠা ১৯৮)
এই পবিত্র উপলক্ষে সাহাবায়ে কেরামের ভাষ্যে বর্ণিত আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)–এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
১. আম্মার ইবনে ইয়াসির (শহীদে সিফফিন)
খারেজমি হানাফি (মৃত্যু: ৫৬৮ হিজরি) তাঁর আল-মানাকিব গ্রন্থে আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)–এর সূত্রে বর্ণনা করেন—
রাসূলুল্লাহ (সা.) আম্মারকে উদ্দেশ করে বলেন, “হে আম্মার! একদল বিদ্রোহী তোমাকে হত্যা করবে। তুমি হকের ওপর থাকবে এবং হক তোমার সঙ্গেই থাকবে। যদি একদিন দেখো, আলী একটি পথে আর মানুষ অন্য পথে, তবে তুমি সেই পথেই থাকবে, যে পথে আলী থাকবে।”
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়—
১) আম্মারের শাহাদাতের পূর্বাভাস
২) তাঁর হত্যাকারীদের বিদ্রোহী ও জালিম হিসেবে চিহ্নিতকরণ
৩) হক নির্ধারণের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে আলীর পথ
২. আবু লাইলা গিফারি
ইবনে আসির জাযারি বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “আমার পরে এক ফিতনা সৃষ্টি হবে। তখন তোমরা আলী ইবনে আবু তালিবের সঙ্গে থাকবে। তিনিই কিয়ামতের দিন প্রথম আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। তিনি সিদ্দিকুল আকবর, হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মুমিন।” (আসাদুল গাবা, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৬৫)
এই হাদিসে রাসূল (সা.) তাঁর পরবর্তী যুগের ফিতনার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, যার বাস্তব রূপ আমরা সাকিফা ও খেলাফত-সংক্রান্ত বিভেদের মধ্যেই দেখতে পাই।
৩. সালমান ফারসি (রা.)
জুয়াইনি শাফেয়ি ও খারেজমি হানাফি উভয়েই সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “আমার পরে আমার উম্মতের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি হলেন আলী ইবনে আবু তালিব।” (ফারায়েদুস সামতাইন, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১০৭)
৪. আয়েশা বিনতে আবু বকর
ইবনে আসাকির দামেস্কি (মৃত্যু: ৫৭১ হিজরি) তারিখে দামেস্ক গ্রন্থে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন— “আল্লাহ আলীর চেয়ে প্রিয় কোনো মানুষ সৃষ্টি করেননি।”
এই বর্ণনা রাসূলুল্লাহ (সা.)–এর সেই দোয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয় যে, আলী (আ.) ছিলেন তাঁর নিকটতম ও সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি।
৫. জাবির ইবনে আবদুল্লাহ আনসারি
হাকিম নিশাপুরি (মৃত্যু: ৪০৫ হিজরি) আল-মুস্তাদরাক গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “আমি জ্ঞানের নগরী, আর আলী তার দরজা। যে জ্ঞান অর্জন করতে চায়, তাকে সেই দরজা দিয়েই প্রবেশ করতে হবে।”
এই হাদিসটি সহিহ ও মুতোয়াতির হিসেবে বহু মুহাদ্দিস কর্তৃক স্বীকৃত।
৬. আবু সাঈদ খুদরি
খতিব বাগদাদি (মৃত্যু: ৪৬৮ হিজরি) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “সৃষ্টির মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হলেন আলী।”
ইমাম যাহাবি আবু সাঈদ খুদরিকে একজন মুজাহিদ ইমাম ও মুজতাহিদ ফকিহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় এখানেই ইতি টানা হলো। বিস্তারিত জানতে লেখকের রচিত গ্রন্থ ‘সাহাবি, তাবেইন ও অন্যান্যদের দৃষ্টিতে আমিরুল মুমিনিনের শ্রেষ্ঠত্ব’ পাঠের আহ্বান জানানো হচ্ছে!
— মোহাম্মদ জাফর তাবাসি
আপনার কমেন্ট