মঙ্গলবার ৬ জানুয়ারী ২০২৬ - ০৬:৩৫
ঐশী ধর্ম প্রেরণের লক্ষ্য মানুষকে মালাকুতি মর্যাদায় উন্নীত করা

আন্তর্জাতিক কংগ্রেস “গাদিরের সংস্কৃতির প্রসার ও নাহজুল বালাগা প্রচারের কৌশল” উপলক্ষে প্রদত্ত এক ভিডিও বার্তায় হযরত আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি বলেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা মানুষের জন্য যে ধর্ম নির্ধারণ করেছেন, সেটিই ফেরেশতাদের জন্য নির্ধারিত ধর্ম। এই ধর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে মালাকুতি—অর্থাৎ ফেরেশতাসদৃশ—মর্যাদায় পৌঁছে দেওয়া।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আমরা মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি—তিনি যেন আমাদের ইসলামি ব্যবস্থা, দেশের শীর্ষ দায়িত্বশীলগণ এবং প্রতিটি বেলায়েতপন্থী নাগরিককে ইমাম মাহদীর (আ.ফা.) বিশেষ অনুগ্রহের আওতায় রাখেন।

এছাড়া যাঁরা প্রবন্ধ উপস্থাপন ও গবেষণামূলক রচনার মাধ্যমে এই কংগ্রেসের ইলমি মান সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি—তিনি যেন তাঁদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ তাঁদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ করেন।

গাদির ও ইমামতের সর্বোত্তম ব্যাখ্যাকারী
গাদিরের ঘটনা মূলত হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর বেলায়েত ও ইমামতের মর্যাদা ব্যাখ্যার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

গাদির ও ইমামতের সর্বোত্তম ব্যাখ্যাকারী স্বয়ং আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)।
তিনি বলেছেন—

 أَلَسْتُ آیَةَ نُبُوَّةِ مُحَمَّدٍ ﷺ

অর্থাৎ, “আমি কি মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তের নিদর্শন নই?” এর তাৎপর্য হলো—তিনি কেবল একজন সৎ বান্দাই নন; বরং নবুয়ত ও রিসালতের এক জীবন্ত প্রমাণ। কেউ যদি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়তের প্রমাণ অনুসন্ধান করে, তবে আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর ঈমানই তার জন্য যথেষ্ট। কারণ তিনি কখনো অসত্য বলেন না, অসত্য বিশ্বাস করেন না এবং সত্য ব্যতীত কিছু গ্রহণ করেন না। এই উচ্চতর বাস্তবতা পূর্ণাঙ্গ নাহজুল বালাগা-র বিভিন্ন স্থানে প্রতিফলিত হয়েছে।

বর্তমানে প্রচলিত নাহজুল বালাগা সেই মহান গ্রন্থের কেবল একটি অংশমাত্র (بضعة منه)। অতএব, পূর্ণাঙ্গ নাহজুল বালাগার সংকলন, সূচিবিন্যাস, শব্দকোষ প্রণয়ন ও গভীর ব্যাখ্যা আজ সময়ের দাবি।

মানুষকে ফেরেশতায় রূপান্তরের ঐশী কর্মসূচি
আমিরুল মুমিনিন (আ.) ব্যাখ্যা করে বলেছেন—আল্লাহ ফেরেশতাদের জন্য যে ধর্ম নির্ধারণ করেছেন, মানুষের জন্যও সেই একই ধর্ম নির্ধারণ করেছেন, যেন মানুষ ফেরেশতার মর্যাদায় উন্নীত হতে পারে।
ফেরেশতারা যেমন— তাওহিদে বিশ্বাসী, ওহি ও আখিরাতে দৃঢ় বিশ্বাসী, বিনয়ী, খোদাভীরু ও ইবাদতকারী— মানুষের জন্যও ঠিক একই আকিদা ও নৈতিক কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে। পার্থক্য কেবল ইবাদতের পদ্ধতিতে; মূল ধর্মে নয়।

এই অর্থেই বলা হয়েছে—
تو فرشته شوی ار جهد کنی
برگ توت است که گشتست به تدریج اطلس
অর্থাৎ, সাধনা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে মানুষ ফেরেশতাসদৃশ মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে। এটাই গাদিরের মূল ও গভীর বার্তা।

মালাকুত ও মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য
ফেরেশতারা মালাকুতের অধিবাসী। নবী ও আওলিয়ারাও মালাকুতের জগতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রাখেন। কুরআনে বলা হয়েছে—

 وَكَذَٰلِكَ نُرِي إِبْرَاهِيمَ مَلَكُوتَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ.

(সূরা আন‘আম: ৭৫)
অর্থাৎ, আল্লাহ হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে সরাসরি মালাকুত প্রদর্শন করেছেন।
কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য নির্দেশ এসেছে—

 أَوَلَمْ يَنظُرُوا فِي مَلَكُوتِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ.

অর্থাৎ, আমাদের দায়িত্ব হলো গভীরভাবে চিন্তা ও পর্যবেক্ষণ করা, যাতে সেই দৃষ্টি একসময় উপলব্ধিতে রূপ নেয়।

দরুদ, বেলায়েত ও মালাকুতি মর্যাদা
আল্লাহ বলেন—

 إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ.

এবং মুমিনদের সম্পর্কে বলেন—

 هُوَ الَّذِي يُصَلِّي عَلَيْكُمْ وَمَلَائِكَتُهُ لِيُخْرِجَكُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ.

যে ব্যক্তি এমন স্তরে পৌঁছে যায়, যেখানে আল্লাহ তাঁর ওপর দরুদ প্রেরণ করেন, সে ব্যক্তি মালাকুতি মর্যাদায় উন্নীত হয়—এটাই গদিরের বাস্তব ফল।

মানবতা বিস্মরণের ভয়াবহ পরিণতি
কুরআন এমন মানুষের সম্পর্কে সতর্ক করে—

 إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ.

এবং আরও বলে—

 وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنسَاهُمْ أَنفُسَهُمْ.

আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার পরিণতিই হলো আত্মবিস্মৃতি—আর তারই ভয়াবহ প্রতিফলন আমরা আজ গাজ্জা ও অনুরূপ মানবিক বিপর্যয়ে প্রত্যক্ষ করছি।

আমরা মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি— তিনি যেন আমাদের শহীদগণ, তাঁদের পরিবারবর্গ এবং সমগ্র উম্মাহকে বিশেষ অনুগ্রহে রাখেন। আমাদের সবাইকে প্রকৃত অর্থে গাদিরের অনুসারী হিসেবে কবুল করেন।

 غفر الله لنا و لکم و السلام علیکم و رحمة الله و برکاته

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha