হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইরানের হাওজা ইলমিয়ার প্রখ্যাত শিক্ষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন হুসাইন আনসারিয়ান তেহরানের নও খানি-আবাদ এলাকায় অবস্থিত হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে তাঁর ধারাবাহিক বক্তৃতামালার চতুর্থ পর্বে কুরআন ও হাদিসের আলোকে ঘর, পরিবার ও সন্তান লালনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, কুরআন ও রেওয়ায়াতের দৃষ্টিতে ঘরের তিনটি মূল ভিত্তি রয়েছে। যদি এই ভিত্তিগুলো আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী গড়ে ওঠে, তবে সেই ঘরে জন্ম নেওয়া সন্তান স্বাভাবিকভাবেই একজন সৎ, ভারসাম্যপূর্ণ ও যোগ্য মানুষে পরিণত হবে।
প্রথম স্তম্ভ: ঈমানদার ও সৎ পিতা
হুজ্জাতুল ইসলাম আনসারিয়ান বলেন, ঘরের প্রথম ও প্রধান স্তম্ভ হলেন পিতা। আল্লাহ তাআলা কুরআনে সৎ ও ধার্মিক পিতার শপথ করেছেন, যা সন্তানের চরিত্র গঠনে পিতার ভূমিকার গুরুত্বকে সুস্পষ্ট করে। যে পিতা ঈমানদার, পবিত্র জীবনযাপনকারী এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকেন, তাঁর সন্তানও সেই পরিবেশের প্রভাবে সৎ ও নৈতিক মানুষ হয়ে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক পিতার পক্ষে হযরত ইবরাহিম (আ.) বা হযরত মুসা (আ.)-এর মতো হওয়া সম্ভব নয়; তবে একজন শান্ত, সংযমী, ঈমানদার ও চরিত্রবান পিতা—যেমন সালমান ফারসি ও আবু যার (রা.)—এর ন্যায় আদর্শিক হওয়া নিঃসন্দেহে সম্ভব। যে পিতা ঘরের ভেতরে এমনকি ছোট গুনাহ থেকেও নিজেকে সংযত রাখেন এবং স্ত্রী ও সন্তানের সামনে কোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত হন না, কুরআনের দৃষ্টিতে তাঁর মর্যাদা এতটাই উচ্চ যে আল্লাহ তাআলা তাঁর শপথ করেছেন।
তিনি একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, আল্লামা মুহাম্মদ তাকী মাজলিসি ‘রওযাতুল মুত্তাকীন’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন; আর তাঁর পুত্র মোল্লা মুহাম্মদ বাকির মাজলিসি পিতার সঠিক লালন-পালনের ফলস্বরূপ সত্তরেরও বেশি মূল্যবান ইলমি গ্রন্থ রচনা করতে সক্ষম হন। এটি পারিবারিক তারবিয়াতের গভীর প্রভাবের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
দ্বিতীয় স্তম্ভ: পর্দাশীলা ও সচ্চরিত্র মাতা
তিনি বলেন, ঘরের দ্বিতীয় স্তম্ভ হলেন মাতা—যাঁকে অবশ্যই পর্দাশীলা, সৎ, চরিত্রবান এবং পরিবারের আমানতদার হতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মাকেও পরিবারের একটি মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। মায়ের আচার-আচরণ, নৈতিকতা ও পবিত্রতা সন্তানের ব্যক্তিত্ব গঠনে প্রত্যক্ষ ও গভীর প্রভাব ফেলে।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হযরত জয়নাবে কুবরা (সা.আ.) কেবল দেহগত খাদ্য থেকেই নয়, বরং আত্মিক ও আধ্যাত্মিক খাদ্য থেকেও পূর্ণমাত্রায় উপকৃত হয়েছেন। তিনি নয় মাস হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর গর্ভে অবস্থান করেন এবং পরবর্তীতে মায়ের ইবাদত, মুনাজাত ও খোদাভীতির পরিবেশে লালিত হন—যা তাঁর মহীয়সী ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তৃতীয় স্তম্ভ: পবিত্র ও হালাল খাদ্য
হুজ্জাতুল ইসলাম আনসারিয়ান বলেন, ঘরের তৃতীয় স্তম্ভ হলো খাদ্য। কুরআনে খাদ্যের বিশেষ গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে; এমনকি আল্লাহ তাআলা ডুমুর ও জলপাইয়ের মতো খাদ্যবস্তুর শপথ করেছেন। এর মাধ্যমে মানুষকে খাদ্যের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—হালাল হওয়া ও পবিত্রতা—উভয় দিক থেকেই।
তিনি বলেন, হালাল ও পবিত্র খাদ্য শুধু দেহকে সুস্থ রাখে না; বরং সন্তানের আত্মা, চরিত্র ও নৈতিক গঠনের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। যদি ঘরের খাদ্য হালাল ও পবিত্র না হয়, তবে তা সন্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই খাদ্য ক্রয়ের অর্থ যেমন হালাল হতে হবে, তেমনি খাদ্য নিজেও হতে হবে হালাল ও পরিচ্ছন্ন।
সৎ পরিবেশে গড়ে ওঠা সন্তানের পরিণতি
তিনি আরও বলেন, যে সন্তান ঈমানদার পিতা, সচ্চরিত্র মাতা ও হালাল খাদ্যের পরিবেশে লালিত হয়, সে হযরত জয়নাবে কুবরা (সা.আ.)-এর মতো উচ্চ চরিত্রের অধিকারী হতে পারে। হযরত জয়নাব (সা.আ.) কেবল হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর ঘরেই লালিত হননি; বরং বিবাহের পর আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর পরিবারে বেলায়েতের পরিবেশ ও হালাল জীবনের মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্ব আরও পূর্ণতা লাভ করে।
মানুষের মর্যাদা ও স্থানের মূল্য
ইরানের এই জনপ্রিয় আলেমে দ্বীন বলেন, কুরআনের দৃষ্টিতে কখনো কখনো ভূমির মর্যাদা মানুষের উপস্থিতির কারণে বৃদ্ধি পায়। কারবালার প্রান্তর ইমাম ও শহীদদের রক্তে ইতিহাসের সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করেছে। ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পবিত্র তুরবা বহু রোগ ও সমস্যার নিরাময়ে আশ্চর্য প্রভাব রেখেছে—যা অসংখ্য মানুষের অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, সঠিক পারিবারিক লালন-পালন ও হালাল খাদ্যের গুরুত্ব কেবল দুনিয়াবি জীবনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আখিরাতের সফলতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সৎ পিতা-মাতা ও পবিত্র খাদ্যের গুরুত্ব কখনোই অবহেলা করা যায় না। এই তিনটি স্তম্ভই একটি সুস্থ পরিবার, আদর্শ সমাজ এবং নেককার সন্তানের মেরুদণ্ড।
আপনার কমেন্ট