বিশেষ সাক্ষাত্কার
হাওজা নিউজ এজেন্সি: আসসালামু আলাইকুম। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও গুরুতর ঘটনা ঘটেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা, সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি প্রদান করা হয়েছে। এই ঘটনা কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য একটি গভীর চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এই জটিল প্রসঙ্গ নিয়ে আমরা কথা বলব বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মাওলানা রুহুল আমিন-এর সাথে। মাওলানা সাহেব, আপনাকে আমাদের মাঝে স্বাগতম।
মাওলানা রুহুল আমিন: ওয়া আলাইকুম আসসালাম, হাসান ভাই। আপনাকে এবং হাওজা নিউজ এজেন্সি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানায় এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার সুযোগ দেওয়ার জন্য।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: মাওলানা সাহেব, প্রথমেই আমাদের দর্শকদের জন্য বিষয়টি পরিষ্কার করুন। এই হুমকি আসলে কী এবং এটি কোন প্রেক্ষাপটে এলো? বিশেষ করে ইসরায়েল-হামাস সংঘাত ও আঞ্চলিক উত্তেজনার এই সময়ে এই হুমকির বিশেষ কোন অর্থ আছে কি?
মাওলানা রুহুল আমিন: ধন্যবাদ প্রশ্নটির জন্য। গত কয়েকদিনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বার্তা প্রচারিত হয়েছে, যেখানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সম্পর্কে সরাসরি হুমকির ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও দায় স্বীকারকারী কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক গোষ্ঠী নয়, বরং সম্ভবত একটি সংগঠিত ডিজিটাল প্রচারণা, তবুও এর তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। এটি আসে এমন একটি সময়ে যখন গাজা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে বাক্যবাণের বিনিময় তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। তাই, এটি কেবল একটি হুমকি নয়; এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, একটি বার্তা পাঠানোর কৌশল। এর লক্ষ্য ইরানের জনগণ ও নেতৃত্বকে ভীতসন্ত্রস্ত করা, পাশাপাশি আঞ্চলিক উত্তেজনাকে এমন এক স্তরে নিয়ে যাওয়া যাতে যেকোনো ছোট ঘটনা বড় সংঘর্ষের দিকে মোড় নিতে পারে।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইরানের পক্ষে এই হুমকি মোকাবেলা করার নিরাপত্তা কৌশল কী হতে পারে? এবং এই হুমকি শুধু ইরান নয়, সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, এমনকি ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে?
মাওলানা রুহুল আমিন: এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ইরান প্রথমেই তাদের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। তাদের নেতৃত্বের শারীরিক নিরাপত্তা ইতিমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম কঠোর বলে পরিচিত। কিন্তু আসল ঝুঁকি আছে ‘প্রতিশোধমূলক’ কর্মকাণ্ডের মধ্যে। যদি ইরান মনে করে যে এই হুমকির পেছনে কোনো রাষ্ট্রীয় শক্তি কাজ করছে, বিশেষ করে ইসরায়েল বা মার্কিন মিত্ররা, তাহলে তারা সরাসরি আঘাত হানতে না পারলেও, তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে আঞ্চলিকভাবে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর অর্থ দাঁড়ায়, গাজা বা লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে নতুন করে সংঘর্ষের সূচনা, অথবা পারস্য উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেল স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে, এটি একটি দেশের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ থেকে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিতে পারে।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: এই হুমকি আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ চার্টারের দৃষ্টিতে কতটা গুরুতর? বিশ্ব সম্প্রদায়, বিশেষ করে চীন, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো শক্তিগুলোর এখানে কী ভূমিকা আশা করা যায়?
মাওলানা রুহুল আমিন: হাসান ভাই, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কোনো রাষ্ট্রের নির্বাচিত বা নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ নেতার বিরুদ্ধে হত্যার হুমকি বা প্রচেষ্টা হল স্পনসরড টেররিজম বা রাষ্ট্রায়ত্ত সন্ত্রাসবাদের সূচক। এটি জাতিসংঘ চার্টারে বর্ণিত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি সরাসরি হুমকি। তবে, দুঃখের বিষয়, বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আইনের শাসনের চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতি বেশি প্রভাবশালী। চীন ও রাশিয়া নিশ্চয়ই আনুষ্ঠানিকভাবে এই হুমকি নিন্দা করবে এবং সংযমের ডাক দেবে, কিন্তু তারা ইরানের প্রতিরক্ষায় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে যাবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি দ্বিধাবিভক্ত অবস্থানে আছে। তারা একদিকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, অন্যদিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চায়। তাদের প্রধান চেষ্টা হবে সংঘাত যেন না ছড়ায়, সেটা নিশ্চিত করা। তবে, সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে নিরপেক্ষ ও শান্তিকামী দেশগুলোর জোট, যেমন ওআইসি। তাদের একযোগে কণ্ঠে এই হুমকির নিন্দা ও সংলাপের আহ্বানই পরিস্থিতি শান্ত করতে পারে।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: ভারতের পররাষ্ট্র নীতির মূলমন্ত্র হলো “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়”। এই নীতির আলোকে ভারতের এবং সামগ্রিকভাবে মুসলিম বিশ্বের এই সংকটে কী ভূমিকা রাখা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
মাওলানা রুহুল আমিন: ভারতের অবস্থান এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। ভারতের উচিত হবে:
১. নৈতিক স্পষ্টতা: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি বিবৃতি দিয়ে যেকোনো রাষ্ট্রের নেতার বিরুদ্ধে হত্যার হুমকিকে স্পষ্ট ও নীতিগতভাবে নিন্দা জানানো। এটি ভারতের শান্তি ও সংহতির প্রতি অঙ্গীকারের পরিচয় দেবে।
২. কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়তা: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও ওআইসির বিভিন্ন ফোরামে ভারত সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। তারা প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে যে, আন্তর্জাতিক বিরোধের সমাধান হুমকি বা বলপ্রয়োগে নয়, শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমেই হতে হবে।
৩. মধ্যস্থতার প্রস্তাব: ভারত তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষ অবস্থান কাজে লাগিয়ে পরোক্ষ মধ্যস্থতার প্রস্তাবও বিবেচনা করতে পারে। আমরা দেখেছি, ইরান-সৌদি সমঝোতায় চীনের ভূমিকা ছিল। শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে ভারতও একটি ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারে।
৪. মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের ডাক: মুসলিম বিশ্ব আজ বিভক্ত। এই হুমকি শুধু ইরানের নয়, মূলত এটি মুসলিম বিশ্বেরই মর্যাদার ওপর আঘাত। ভারতের ধর্মীয় নেতারা, আলেমরা এখানে একটি ঐক্যবদ্ধ বক্তব্য দিতে পারেন যে, কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এ ধরনের হুমকি পুরো উম্মাহর প্রতি অপমান।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: মাওলানা সাহেব, শেষ প্রশ্ন। আপনার কি মনে হয়, এই সংকটের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কী দুর্বলতা ফাঁস হয়ে পড়ছে? সাধারণ মানুষ ও তরুণ প্রজন্মের এ থেকে কী শিক্ষা নেওয়া উচিত?
মাওলানা রুহুল আমিন: হাসান ভাই, এই সংকটে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা – নির্বাচিত দ্বিচারিতা – স্পষ্ট হয়ে গেছে। যখন একটি শক্তিশালী দেশ বা তার মিত্ররা একই কাজ করে, তখন আন্তর্জাতিক ফোরাম নিশ্চুপ থাকে। কিন্তু যখন অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা বৈরী রাষ্ট্র কোনো কাজ করে, তখন তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা ও সমালোচনা আসে। এই দ্বিচারিতা বিশ্বব্যবস্থায় অবিশ্বাস ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করে।
আমাদের তরুণ প্রজন্মের এখান থেকে শিক্ষা হলো:
· আন্তর্জাতিক রাজনীতি শুধু শক্তির রাজনীতি নয়, ন্যায়-অন্যায়েরও রাজনীতি। আমাদের নৈতিক অবস্থান নিতে হবে।
· সংঘাত ও যুদ্ধ কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান দেয় না। গাজা, লেবানন, ইয়েমেন এর জ্বলন্ত প্রমাণ।
· আমাদের নিজেদের দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সচেতন থাকতে হবে এবং বৈশ্বিকভাবে শান্তির কণ্ঠস্বর হতে হবে।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: মাওলানা রুহুল আমিন, আপনার এই গভীর, বিশ্লেষণধর্মী ও শিক্ষণীয় মতামতের জন্য হাওজা নিউজ এজেন্সির পক্ষ থেকে, আমার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে এবং নিশ্চয়ই আমাদের দর্শকদের পক্ষ থেকে অশেষ ধন্যবাদ জানায়।
মাওলানা রুহুল আমিন: আমিও আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ জানায়। আসুন, আমরা সবাই শান্তি ও ইনসাফের পক্ষে কথা বলি। আল্লাহ আমাদের সকলকে হেফাজত করুন।
আপনার কমেন্ট