হাওজা নিউজ এজেন্সি: সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে বক্তব্য দিতে গিয়ে আরাকচি বলেন, ইরান কখনো কোনো যুদ্ধের সূচনা করেনি। আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্বৈত মানদণ্ড পরিহার করা অপরিহার্য।
তিনি বহুপাক্ষিকতা ও আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় এসসিওকে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের উৎস ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য বৈধ প্রতিরক্ষামূলক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
আরাকচি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান বৈধ আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার সংরক্ষণ করে। ইরানি জাতির বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের উৎসকে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী বৈধ প্রতিরক্ষামূলক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের পর জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ইরান তার সহজাত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেছে। একই সঙ্গে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, ইরান কখনো কোনো যুদ্ধের সূচনাকারী ছিল না।
তার ভাষায়, ইরানের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই সংলাপ, কূটনীতি, সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তবে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের অবসান এবং দ্বৈত মানদণ্ড পরিহার ছাড়া টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমালোচনা
আরাকচি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমালোচনা করে বলেন, তাদের ধারাবাহিক হামলা শুধু ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার ওপরই আঘাত হানেনি; বরং আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থার মৌলিক নীতিগুলোকেও ক্ষুণ্ন করেছে।
তিনি বলেন, এসব হামলায় বেসামরিক স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, অর্থনৈতিক কেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর তত্ত্বাবধানে থাকা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
তার মতে, এসব ঘটনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কবার্তা
আরাকচি বলেন, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বহিরাগত শক্তির উপস্থিতির মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং এ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং যৌথ দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপরিবহনেও বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।
লেবানন ও গাজা প্রসঙ্গ
বক্তব্যে আরাকচি লেবাননের ওপর ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার তীব্র নিন্দা জানান এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন।
তিনি গাজার মানবিক সংকটকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার অন্যতম গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ, মানবিক সহায়তার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি বন্ধ এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
এসসিওর ভূমিকা জোরদারের আহ্বান
আরাকচি বলেন, বহুপাক্ষিকতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রগুলোর সমতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের পক্ষে আরও শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে এসসিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তিনি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজীকরণ, আঞ্চলিক ট্রানজিট নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ এবং স্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানান।
পরিশেষে আরাকচি বলেন, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং আন্তর্জাতিক জলসীমার সংযোগস্থলে অবস্থিত কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইরান পরিবহন, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে প্রস্তুত রয়েছে।
আপনার কমেন্ট