হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরাকে অনুষ্ঠিত ‘নিদাউল কুদস’ সম্মেলনে আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি ইসলামী বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে বলেন, আজ ইসলামী বিশ্ব তার সমসাময়িক ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ও অস্থির সময়গুলোর একটির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ইসলামী উম্মাহর মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের জন্য অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে; অন্যদিকে গভীর সংকট ও হুমকি এই ঐক্যবদ্ধ দেহকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। এমন এক সংবেদনশীল ও ভাগ্যনির্ধারক সময়ে ইসলামের আলেমদের সচেতনতা, দূরদৃষ্টি ও সাহসের মতো আর কোনো উপাদান ভবিষ্যতের দিগন্ত উন্মোচন এবং এই কঠিন সময় অতিক্রমে উম্মাহকে সঠিক পথ দেখাতে এতটা কার্যকর হতে পারে না।
ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রসমূহের প্রধান আরও বলেন, আজ আমাদের সামনে এমন অনেক উজ্জ্বল আলেম ও চিন্তাবিদের উদাহরণ রয়েছে, যারা সমগ্র ইসলামী বিশ্বে এবং বিভিন্ন ইসলামী দেশে এই দায়িত্ব ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন; বিশেষ করে ইরাক ও ইরানে। তিনি বিশেষভাবে ইমাম খোমেনি, শহীদ ইমাম আয়াতুল্লাহ আল-উজমা খামেনেয়ী, শহীদ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুহাম্মদ বাকির আস-সদর, আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সিস্তানি, শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ এবং অন্যান্য বিশিষ্ট নেতার অভিজ্ঞতাকে মূল্যবান শিক্ষার উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, যখনই ধর্মীয় আলেম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অভিজাতরা ঐক্য ও গঠনমূলক সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পেরেছেন, তখনই ইসলামী বিশ্বের উন্নতি ও অগ্রগতির পথ আরও সুগম হয়েছে এবং বিভিন্ন জাতির পারস্পরিক সম্পর্কও আরও সুস্থ ও দৃঢ় হয়েছে।
আয়াতুল্লাহ আরাফির মতে, আজ অঞ্চলে যা ঘটছে, তা একদিকে এই অঞ্চলের উম্মাহ ও জাতিসমূহের সঙ্গে এবং অন্যদিকে পশ্চিমা-আমেরিকান ঔপনিবেশিক প্রকল্পের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী এক সভ্যতাগত সংঘাতের অংশ। এই প্রকল্প বহু বছর ধরে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী অঞ্চলের মানচিত্র পুনর্গঠন, ইসলামী উম্মাহর সক্ষমতা ও সম্পদকে খণ্ডিত ও দুর্বল করা এবং ছোটখাটো সংঘাত ও গৌণ বিরোধ উসকে দিয়ে আমাদের প্রকৃত ও ভাগ্যনির্ধারক সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু থেকে বিচ্যুত রাখার চেষ্টা করে আসছে।
তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, আমাদের প্রকল্প ও কৌশল হলো ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা, সংঘাত ও বিভেদের প্রকল্প নয়; আর আমাদের বক্তব্য হলো প্রতিরোধ ও বিজয়ের বক্তব্য, আত্মসমর্পণ ও পরাজয়ের নয়।” তিনি আরও বলেন, “এসব শুধু তাত্ত্বিক দাবি নয়; বরং বাস্তব সত্য, যা আমাদের নেতারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং নাজাফ আশরাফ, পবিত্র কুম ও ইসলামী বিশ্বের অন্যান্য ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রের শীর্ষ আলেম ও মারজাগণ বাস্তবে তুলে ধরেছেন এবং ব্যাখ্যা করেছেন।
আয়াতুল্লাহ আরাফি আরও বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কখনো মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ বা সংঘাতের সূচনাকারী ছিল না। বরং দেশটি সবসময় সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং আগ্রাসন এড়ানোর নীতিতে অটল থেকেছে। একই সঙ্গে আরব ও ইসলামী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমন, সহনশীলতা ও গঠনমূলক সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করে সংকটের আগুন নেভানোর জন্য ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেছে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, গত কয়েক দশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর অপরাধ, যুদ্ধ, ষড়যন্ত্র, সন্ত্রাসী হামলা এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে; যার মধ্যে কিছু আঞ্চলিক রাষ্ট্র এবং অন্যান্য পক্ষ সরাসরি ভূমিকা পালন করেছে।
গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ফকিহ সদস্য আরও বলেন, সাম্প্রতিক আগ্রাসনের সময় আমরা প্রকাশ্য আগ্রাসন ও নির্লজ্জ অবিচারের শিকার হয়েছি, যা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শাসনের প্রকাশ্য ও গোপন ঘাঁটি এবং কেন্দ্রগুলো থেকে পরিচালিত হয়েছে। এ বাস্তবতাকে অঞ্চলের কৌশলগত সমীকরণ সম্পর্কে সচেতন ও বিবেকবান কোনো মানুষ অস্বীকার করতে পারে না।
আয়াতুল্লাহ আরাফি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শাসনের কর্মকাণ্ডে কিছু ইসলামী দেশের নেতাদের সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, “আমরা ভালোভাবেই জানি যে, অঞ্চলের কিছু সরকার এ অঞ্চলের ভাগ্য-ভবিষ্যতের ওপর জায়নবাদী আধিপত্য বিস্তারে গভীরভাবে জড়িত। তারা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর-যাকে তিনি একজন নৃশংস যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিহিত করেন-ফিলিস্তিন, গাজা, ইসলামী উম্মাহর সন্তানদের এবং ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত হত্যাযজ্ঞে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। ইরানকে তিনি ইসরায়েলি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রধান সমর্থক এবং ফিলিস্তিনি আদর্শ রক্ষার শেষ দুর্গ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রসমূহের প্রধানের মতে, ইসরায়েলি শাসনের অপরাধের মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপমূলক নীতি ও একতরফা আধিপত্যবাদ। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সব চুক্তি এবং জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি আধিপত্যকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং পশ্চিম তীরের কিছু অংশ ও সিরিয়ার গোলান মালভূমিকে দখলদার শাসনের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন যুদ্ধ ও ষড়যন্ত্রের নেপথ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ছিল এবং সেগুলোর পরিকল্পনা ও পরিচালনার দায়িত্বও সে-ই নিয়েছে।
গার্ডিয়ান কাউন্সিলের এই সদস্য স্মরণ করিয়ে দেন যে, ফিলিস্তিন দখলের প্রথম দিন থেকেই ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন আন্দোলন এই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করেছিল। দখলকৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার এবং ফিলিস্তিনের ইসলামী পবিত্র স্থানসমূহ মুক্ত করার লক্ষ্যে জিহাদের ফতোয়া জারি করা হয় এবং মুসলিম আলেমরা এই সংগ্রামের অগ্রভাগে অবস্থান নেন। তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় শিয়া মারজাগণ-যেমন আয়াতুল্লাহ বোরুজেরদি, আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আবুল কাসেম খুই এবং আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুহসিন হাকিম (আল্লাহ তাঁদের প্রতি রহম করুন)-দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আয়াতুল্লাহ আরাফি আরও বলেন, একইভাবে আহলে সুন্নাতের বহু আলেমের জিহাদসংক্রান্ত ফতোয়ার কথাও আমাদের স্মরণ রাখা উচিত। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শাইখ মাহমুদ শেনাওয়ি, শাইখ হাসান মামুন এবং আরও অনেকে। আজ সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ইসরায়েলি শাসন হতাশা ও ব্যর্থতার মুখে পড়েছে এবং নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ডে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন থেকে কার্যত নিরাশ হয়েছে। এখন তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সব ধরনের উপায় অবলম্বন করছে। এ কারণেই তারা গাজা, প্রিয় লেবানন, ইসলামী ইরান, গৌরবময় ইরাক, প্রতিরোধী ইয়েমেন এবং অন্যান্য অঞ্চলে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।
আয়াতুল্লাহ আরাফির মতে, ফিলিস্তিন ও সমগ্র ইসলামী উম্মাহর মুক্তির পথ হলো জিহাদ ও প্রতিরোধের পথ। তিনি বলেন, জিহাদ ও প্রতিরোধ যুক্তি, মানবিক বিবেক এবং আত্মরক্ষার বৈধ অধিকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আন্তর্জাতিক আইনও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও লেবাননের জনগণের এই অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তিনি আরবাঈনের মহাপদযাত্রার কথাও উল্লেখ করে বলেন, আরবাঈনের এই বিশাল পদযাত্রার মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ উম্মাহ গড়ে তোলার বিরাট সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও আহলে বাইত (আ.)-এর পতাকাতলে ঐক্য, সংহতি ও পারস্পরিক সহযোগিতাই মর্যাদা, শক্তি এবং শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ের প্রধান ভিত্তি। এর বরকতেই জটিলতা ও সংকটের সমাধান সম্ভব হয়।
আয়াতুল্লাহ আরাফির ভাষায়, সভ্যতা-নির্মাণকারী আরবাঈন আত্মত্যাগ, ভালোবাসা, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতার এক মহান শিক্ষালয়। এটি ইসলামী উম্মাহর ধর্মীয় পরিচয় ও জীবনকে পুনর্গঠনে মৌলিক ভূমিকা রাখতে পারে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নেতৃত্ব ও ইমামতের সূর্যোদয়ের জন্য, তথা সমগ্র মানবজাতির প্রতীক্ষিত ত্রাণকর্তা হযরত বাকিয়াতুল্লাহ আল-আযম (আ.)-এর নূরে বিশ্বকে আলোকিত করার পথ সুগম করতে সক্ষম।
আপনার কমেন্ট