বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১৫:৫৮
শিয়া মারজায়িয়াতের প্রতি জনগণের স্মরণীয় শ্রদ্ধা

শিয়া মারজায়িয়াতের প্রতি জনগণের স্মরণীয় শ্রদ্ধা

ফিকাহ ও নৈতিকতার আদর্শের সঙ্গে কুমের ঐতিহাসিক বিদায়

পবিত্র কোম নগরী-যা আহলে বাইত (আ.)-এর আশ্রয়ভূমি হিসেবে পরিচিত-এর জনগণ ও আলেমসমাজ আজ আবারও প্রমাণ করলেন, ফিকাহ, ঈমান, নৈতিকতা ও ধর্মীয় জ্ঞানের স্তম্ভ হিসেবে আলেম ও মারজায়ে তাকলিদদের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা ও গভীর অনুরাগ কতটা প্রবল।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, আজ বুধবার কোমে সরকার ও প্রাদেশিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারি ছুটি ঘোষণা না করা হলেও, আয়াতুল্লাহিল উজমা সাইয়্যেদ মুসা শুবাইরি জাঞ্জানি (রহ.)-এর পবিত্র মরদেহের জানাজা ও শোকযাত্রায় বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেখা যেত-এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

সাধারণ জানাজার চেয়েও বৃহত্তর এক শোকযাত্রা

যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে সকাল ৯টায় জানাজা ও শোকযাত্রা শুরু হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল, কিন্তু তার প্রায় এক ঘণ্টা আগেই কালো পোশাক পরিহিত বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ, বিশেষ করে আলেম, ধর্মীয় শিক্ষার্থী ও তালাবারা কুমের জিহাদ স্কয়ারের আশপাশে জড়ো হতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে জনসমাগম বৃদ্ধি পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে শোকযাত্রা শুরু হয়।

এই আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠানে বিশেষ করে আলেম ও জ্ঞানসন্ধানী মুমিনদের বিপুল ও আবেগঘন উপস্থিতি শিয়া মারজায়িয়াতের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে হারানোর শোককে এক অনন্য আবেগময় পরিবেশে পরিণত করে। এতে আবারও প্রতীয়মান হয় যে, এ ধরনের অনুষ্ঠান কেবল একটি সাধারণ জানাজা নয়; বরং ধর্মীয় মারজায়িয়াত ও ধর্মপ্রাণ জনগণের মধ্যে গভীর সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়।

শিয়া মারজায়িয়াতের প্রতি জনগণের স্মরণীয় শ্রদ্ধা

একজন মারজায়ে তাকলিদের বিদায়ে আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ব্যাপক উপস্থিতি

অন্যদিকে, হাওযায়ে ইলমিয়ার বিশিষ্ট আলেমদের নিয়ে গঠিত দীর্ঘ সারিগুলোতে ধর্মীয় পোশাক ও শোকভারাক্রান্ত গাম্ভীর্যের যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা সমাজের প্রতি ঐক্য এবং মারজায়িয়াতের ধারাবাহিকতার একটি বার্তা বহন করেছে।

তাঁদের এই উপস্থিতি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মরহুম আয়াতুল্লাহিল উজমা শুবাইরি জাঞ্জানি (রহ.)-এর ফিকহি চিন্তাধারা এমন এক ঐতিহ্য, যা আলেমসমাজের বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে গভীরভাবে শিকড় গেড়েছে এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে তা স্থানান্তরিত হচ্ছে।

আজকের জনসমাগমের আবহ ছিল একদিকে একজন মহান ও রাব্বানি শিক্ষকের বিয়োগে অশ্রু ও গভীর শোকের, অন্যদিকে তাঁর গুণাবলি, তাকওয়া ও মহৎ চরিত্রের কথা স্মরণ করে সৃষ্ট এক ধরনের সান্ত্বনার।

অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে ইমাম মাহদি (আ.)-এর প্রতি এই মহান ব্যক্তিত্বের বিয়োগে সমবেদনা জানিয়ে বিভিন্ন শোকগাথা ও কবিতা পাঠ করা হয়। অন্যান্য আলেম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জানাজার মতো এখানেও সাইয়্যেদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইন (আ.) ও হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.)-এর স্মরণে মারসিয়া ও শোকগাথা পরিবেশিত হয়। পাশাপাশি আহলে বাইত (আ.)-এর প্রশংসাকারী ও শোকগাথা পাঠকারীদের কণ্ঠে সাহিবুল আমর ইমাম মাহদি (আ.)-এর বিরহে নওহা পাঠও শোনা যায়।

এ ছাড়া নিষ্পাপ ইমামগণের নামসংবলিত পতাকা, দেশের পবিত্র পতাকা এবং ‘ইয়া লাসারাতাল হুসাইন’-অর্থাৎ ‘হে হুসাইনের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা’-লেখা লাল পতাকাগুলো দীর্ঘ শোকযাত্রার পথে উড়তে দেখা যায়। এসব দৃশ্য পুরো অনুষ্ঠানকে এক বিশেষ আবহ প্রদান করে।

শিয়া মারজায়িয়াতের প্রতি জনগণের স্মরণীয় শ্রদ্ধা

ফিকাহ ও ধর্মীয় জ্ঞানের আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র

জনসমুদ্রের মাঝে হঠাৎ পরিচিত এক আলেমের ওপর আমার চোখ পড়ল। তিনি ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, যাঁর কাছ থেকে কুম বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনার সময় আমি কয়েক বছর শিক্ষা গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেছিলাম।

কোম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অধ্যাপক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আদেল সারিখানি মরহুমের ইন্তেকালে শোক ও সমবেদনা জানিয়ে সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় বলেন: মরহুম আয়াতুল্লাহ শুবাইরি জাঞ্জানি হাওযার জ্ঞানচর্চার বিকাশ এবং আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে এক বিশাল কর্মময় অতীত ও উজ্জ্বল কর্মজীবনের অধিকারী ছিলেন। তিনি আয়াতুল্লাহ বুরুজার্দি, আয়াতুল্লাহ খুয়েই ও মুহাক্কিক দামাদসহ বিশিষ্ট আলেমদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।

তিনি বহু বছর গবেষণা, অধ্যয়ন, পাঠদান এবং অসংখ্য ছাত্র গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। এভাবে তিনি আমাদের জন্য হাওযার মৌলিক ঐতিহ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ফিকহ ও উসুলের গুরুত্বপূর্ণ একটি জ্ঞানভাণ্ডার রেখে গেছেন।

তিনি আরও বলেন: তিনি প্রকৃত অর্থেই হাওযায়ে ইলমিয়ার ফিকহ, উসুল, কালাম ও রিজালশাস্ত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন ছিলেন। জ্ঞান, তাকওয়া, ইখলাস ও নৈতিকতার ওপর নির্ভর করে তিনি মুমিন জনসাধারণের হেদায়াতের পথে কাজ করেছেন।

নিঃসন্দেহে তাঁর ইন্তেকাল শিয়া জ্ঞানজগৎ এবং সমগ্র ইসলামী বিশ্বে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। এই ক্ষতি পূরণের একমাত্র উপায় হলো তাঁর জ্ঞানচর্চা ও নৈতিকতার পথকে অব্যাহত রাখা।

শিয়া মারজায়িয়াতের প্রতি জনগণের স্মরণীয় শ্রদ্ধা

আহলে বাইতের জ্ঞান অর্জন ও প্রচারের ক্ষেত্রে এক অনন্য আদর্শ

শোকযাত্রা এগিয়ে চলছিল। বাজার চৌরাস্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক তরুণ তালাবার সঙ্গে আমার কথা হয়। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার মতে, মরহুম আয়াতুল্লাহিল উজমা শুবাইরি জাঞ্জানির মতো আলেম ও মনীষীদের জনপ্রিয়তা এবং মানুষের হৃদয়ে তাঁদের স্থায়ী অবস্থানের রহস্য কী?

তিনি জবাব দিলেন: আমি হাওযার ষষ্ঠ স্তরের একজন তালাবে ইলম। এই মহান ও পরহেজগার মারজায়ে তাকলিদের দরসে সরাসরি অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তবে আমাদের বহু শিক্ষকের কাছ থেকে তাঁর সম্পর্কে অনেক প্রশংসনীয় কথা শুনেছি।

তাঁর মধ্যে পরহেজগারি, তাকওয়া ও বিনয় যেমন ছিল, তেমনি ছিল গভীর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। ফিকহ ও উসুলের বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করার সময় তিনি চেষ্টা করতেন, যাতে তালাবা ও ফুযালা বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে পারেন। তিনি কখনোই কোনো বিষয়কে অগভীরভাবে অতিক্রম করে যেতেন না।

তিনি আরও বলেন: ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, তাঁর জীবনাচরণ ও জীবনধারা ছাড়াও এই মরহুম মারজায়ে তাকলিদের রেখে যাওয়া জ্ঞানভিত্তিক রচনাবলিই আহলে ইলম এবং কুরআন ও ইতরাতের শিক্ষার প্রচারে নিবেদিত ব্যক্তিদের জন্য তাঁর সর্বোত্তম স্মারক।

এই মহান ব্যক্তিত্বরা তাঁদের জ্ঞাননির্ভর, নিষ্ঠাপূর্ণ এবং একই সঙ্গে সরল-সাদাসিধে জীবনযাপনের মাধ্যমে নিষ্পাপ ইমামদের (আ.) আদর্শ অনুসরণ করেছেন। এ কারণেই তাঁরা আমাদের জনগণের জন্য, বিশেষ করে হাওযায়ে ইলমিয়ার তালাবা ও ফুযালাদের জন্য, সর্বোত্তম আদর্শ।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha