মঙ্গলবার ১৩ অক্টোবর ২০২৬ - ১১:৩৪
ইসলামী বিশ্বের অন্যতম প্রধান অভিন্ন বন্ধন হলো মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পেশোয়ারস্থ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রধান বলেছেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ইসলামী বিশ্বের অন্যতম প্রধান অভিন্ন বন্ধন। এটি মুসলিম জাতিগুলোর আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক পরিচয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

হাওজা নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেশোয়ারের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ইদরাক’-এর উদ্যোগে এবং পেশোয়ারে অবস্থিত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সহযোগিতায় মহানবী (সা.)-এর প্রশংসায় রচিত কবিতা আবৃত্তির একটি সাহিত্য আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে উর্দু, পাশ্তু ও হিন্দকো ভাষার বহু সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, কবি এবং কবিতা ও সাহিত্যানুরাগী অংশগ্রহণ করেন।

পেশোয়ারে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের উপ-কনসাল জেনারেল হাসান মোয়াজ্জামি বলেন, এই সাহিত্য আসর এমন এক মহান নবীর মর্যাদা স্মরণ করার সুযোগ, যাঁর অস্তিত্বের আলো ও শিক্ষা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে। কবি, সুফি সাধক ও চিন্তাবিদদের রচনায় তাঁর মহত্ত্ব নানা রূপে প্রকাশিত হয়েছে।

ইরানের উপ-কনসাল জেনারেল ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে মহানবী (সা.)-এর অবস্থান তুলে ধরে মাওলানা জালালুদ্দিন মুহাম্মদ বলখি, খাজা শামসুদ্দিন মুহাম্মদ হাফিজ শিরাজি, সাদি শিরাজি এবং আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল লাহোরির নাম উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এসব বিশিষ্ট কবির রচনায় ইসলামের নবীর প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদার বর্ণনা বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

তিনি আরও বলেন, ইরান, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান ও ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মধ্যে এসব কবির নাম ও সাহিত্যকর্মের স্থায়ী জনপ্রিয়তা শুধু তাঁদের কাব্যিক সৌন্দর্যের কারণে নয়; বরং এর শিকড় রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক ও মানবিক মূল্যবোধ এবং মহানবী মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা.)-এর প্রতি তাঁদের গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার মধ্যে।

মাওলানার চিন্তাধারার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মোয়াজ্জামি বলেন, এই মহান কবি ও সুফি সাধকের দর্শনে মহানবী (সা.) সত্য, ভালোবাসা ও জ্ঞান অর্জনের পথে মানুষের পথপ্রদর্শক। তাঁর শিক্ষা মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে সত্যের আলোয় পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারে।

তিনি হাফিজের কবিতার কথাও উল্লেখ করেন এবং ইসলামের নবীর প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে সাদির কবিতাকে ফারসি সাহিত্যে মহানবী (সা.)-এর প্রশংসামূলক কবিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেন।

মোয়াজ্জামি বলেন, মাওলানা, হাফিজ, সাদি ও ইকবাল ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল ও ঐতিহাসিক সময়ের মানুষ হলেও মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা এবং সত্য ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি অনুরাগের ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে গভীর মিল রয়েছে। এই সাহিত্যিক ও আধ্যাত্মিক বন্ধন শুধু কবিদের মধ্যকার সম্পর্ক নয়; বরং বিভিন্ন জাতির সাংস্কৃতিক সংযোগেরও প্রতিফলন।

তাঁর মতে, ভৌগোলিক প্রতিবেশী হওয়ার পাশাপাশি ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সম্পর্কেরও গভীর শিকড় রয়েছে। ফারসি সাহিত্য এবং মহান কবিদের ঐতিহ্য এই অভিন্ন সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।

নবীজির আদর্শ: জাতিগুলোর মধ্যে সম্প্রীতি ও ঐক্য প্রসারের ভিত্তি

পেশোয়ারে ইরানের উপ-কনসাল জেনারেল বলেন, পাকিস্তানে মাওলানা ও হাফিজের ব্যাপক পরিচিতি এবং ইরানে ইকবালের কবিতার বিশেষ মর্যাদা প্রমাণ করে যে সংস্কৃতি ও সাহিত্য ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে বিভিন্ন জাতিকে পরস্পরের কাছাকাছি আনতে পারে।

তিনি বলেন, এসব মহান কবির অভিন্ন বার্তা হলো মানবিক সম্পর্ক, ভালোবাসা, সত্যের অনুসন্ধান, জাগরণ এবং মানুষের মর্যাদার প্রতি গুরুত্বারোপ। মহানবী (সা.) রহমতের বার্তাবাহক হিসেবে ব্যক্তি ও জাতির পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নৈতিকতা, সহনশীলতা ও মানবিক আচরণ প্রসারের আদর্শ।

পেশোয়ারে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রধান হোসেইন চাকামি বলেন, মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা কেবল একটি ধর্মীয় বিষয় নয়; এটি মুসলিম জাতিগুলোর আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক পরিচয়ের অংশ। অন্যভাবে বললে, মহানবী মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ইসলামী বিশ্বের অন্যতম প্রধান অভিন্ন বন্ধন।

তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মহানবী (সা.)-এর বার্তার প্রয়োজন। এই বার্তা মানুষকে সহিংসতার পরিবর্তে দয়া, অবমাননার পরিবর্তে মর্যাদা, শত্রুতার পরিবর্তে সংলাপ এবং জুলুমের পরিবর্তে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়।

পবিত্র কোরআনও মহানবী (সা.)-কে এক ব্যাপক ও সুন্দর অভিব্যক্তির মাধ্যমে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে:

“আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” (সুরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ১০৭)

এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ইসলামের নবীর রিসালাত কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ভূখণ্ড বা ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁর রহমতের বার্তা সমগ্র মানবজাতিকে অন্তর্ভুক্ত করে।

বর্তমান বিশ্বে ইসলামের নবীর বার্তা অত্যন্ত জরুরি

পেশোয়ারের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ইদরাক’-এর প্রধান, সমালোচক, সাহিত্যিক ও টেলিভিশন অভিনেতা নাসের আলী সাইয়্যেদ প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ও কার্যক্রম সম্পর্কে বলেন, কবিদের সহায়তা এবং সাহিত্যচর্চার প্রসারে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে কবিদের অংশগ্রহণ ও সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন কারণে যেসব কবি সাহিত্য আসর ও কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান থেকে দূরে সরে গেছেন কিংবা এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আশা হারিয়ে ফেলেছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

এই পাকিস্তানি সাহিত্যিক জানান, তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে সাহিত্যিক সমাজের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাঁদের রচনা প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নাসের আলী সাইয়্যেদ কবিদের কাব্যগ্রন্থ মুদ্রণ ও প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভাষাগত সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে কবিতা ও সাহিত্যচর্চার প্রসার ঘটানোও প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম লক্ষ্য।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে ত্রৈমাসিক একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha