মঙ্গলবার ১৩ অক্টোবর ২০২৬ - ১১:১১
রোজা, দান-সাদকা ও ইখলাস-শয়তানের অনুপ্রবেশ মোকাবিলার উপায়

সারায়ানের জাফরিয়া হাওজা ইলমিয়ার পরিচালক বলেছেন, ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ধর্মীয় শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি হাদিসের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি রোজা পালন, দান-সদকা, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসা, নেক আমলে অবিচল থাকা এবং ইস্তিগফারকে শয়তানের অনুপ্রবেশ মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে উল্লেখ করেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারায়ানের জাফরিয়া হাওজা ইলমিয়ার পরিচালক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আব্বাস আলিজাদে ওই প্রতিষ্ঠানের নৈতিকতা বিষয়ক ধারাবাহিক আলোচনায় ‘শয়তানের অনুপ্রবেশ প্রতিরোধের উপায়’ শীর্ষক বিষয়ে বক্তব্য দেন। তিনি পবিত্র কোরআন ও ইসলামী বর্ণনার আলোকে শয়তানের কুমন্ত্রণা মোকাবিলার বিভিন্ন উপায় ব্যাখ্যা করেন।

মহানবী (সা.)-এর একটি হাদিসে রোজা, দান-সদকা, আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, নেক আমলে অবিচল থাকা এবং ইস্তিগফারের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এসব শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

রোজা পালন-ইচ্ছাশক্তি দৃঢ় করার উপায়

সারায়ানের জাফরিয়া হাওযা ইলমিয়ার পরিচালক আত্মশুদ্ধিতে রোজার ভূমিকা সম্পর্কে বলেন, রোজা এমন একটি ইবাদত, যা মানুষের ইচ্ছাশক্তি দৃঢ় করতে এবং প্রবৃত্তির চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে। ইসলামী রেওয়ায়েতে শয়তানের অনুপ্রবেশ মোকাবিলার অন্যতম উপায় হিসেবেও রোজার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষত সোমবার ও বৃহস্পতিবার নফল রোজা পালনে কিছু মুমিনের আগ্রহের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কঠিন পরিস্থিতিতেও আল্লাহর ইবাদতে অবিচল থাকা গুরুত্বপূর্ণ। আধ্যাত্মিকতা শক্তিশালী করার পথে মানুষকে ইবাদত পালনে যত্নবান হতে হবে।

দান-সাদকা-শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আলিজাদে দান-সাদকা ও পরোপকারকে শয়তানের অনুপ্রবেশ মোকাবিলার আরেকটি উপায় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি “كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ”-“প্রত্যেক ভালো কাজই সদকা”-এই হাদিসের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, সদকা কেবল অর্থ প্রদান বা আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অন্যের প্রয়োজন পূরণ এবং তার সমস্যা সমাধানে করা যেকোনো ভালো কাজই পরোপকারের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, পরিবারের সদস্যদের সেবা করা, সম্মিলিত কাজে অংশ নেওয়া, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং দৈনন্দিন দায়িত্ব পালন করাও ভালো কাজের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত। নৈতিক শিক্ষার প্রকৃত প্রভাব তখনই প্রকাশ পায়, যখন তা শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের বাস্তব আচরণে প্রতিফলিত হয়।

আমলের ইখলাস-বিভ্রান্তি থেকে সুরক্ষার উপায়

সারায়ানের জাফরিয়া হাওজা ইলমিয়ার পরিচালক ইখলাসকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে সুরক্ষিত থাকার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি সুরা সোয়াদের ৮২ ও ৮৩ নম্বর আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, সেখানে ইবলিসের বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা থেকে আল্লাহর মুখলিস বা একনিষ্ঠ বান্দাদের ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আয়াত দুটিতে বলা হয়েছে: আপনার সম্মানের শপথ! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব, তবে তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের ছাড়া। -সুরা সোয়াদ, ৩৮:৮২–৮৩

এই আয়াতের মর্ম অনুযায়ী, ইবলিস মানুষকে পথভ্রষ্ট করার শপথ করেছিল; তবে আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দারা এর ব্যতিক্রম।

ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডে নিয়ত সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পাঠদানে অংশগ্রহণ, ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন এবং সমাজের সেবা করার উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও মানুষের প্রয়োজন পূরণ। কেবল খ্যাতি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা ব্যক্তিগত অবস্থান অর্জন এসব কাজের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়।

নেক আমলে ধারাবাহিকতা-আল্লাহর ইবাদতে অবিচল থাকার চাবিকাঠি

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আলিজাদে নেক কাজে ধারাবাহিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, মানুষের আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা এবং আধ্যাত্মিক অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেক আমল তখনই বেশি কার্যকর হয়, যখন তা নিয়মিতভাবে করা হয়-এমনকি আমলের পরিমাণ অল্প হলেও।

তিনি বলেন, ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা, নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায় করা, প্রতিদিন পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করা এবং দোয়া ও জিকিরের প্রতি যত্নবান হওয়া-এসব অভ্যাস ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখলে ধর্মীয় জীবনধারা আরও শক্তিশালী হয়।

ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পথে নানা কঠিন পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি ধৈর্য, দায়িত্বশীলতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রেরণা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডে সাফল্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো নিয়মিতভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করা।

ইস্তিগফার-ভুল সংশোধন ও ফিরে আসার সুযোগ

সারায়ানের জাফরিয়া হাওজা ইলমিয়ার পরিচালক ইস্তিগফারকে শয়তানের অনুপ্রবেশ মোকাবিলার আরেকটি উপায় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জীবনের পথে মানুষ ভুল ও বিচ্যুতির শিকার হতে পারে। তাই আল্লাহর কাছে ফিরে আসা এবং নিজের ভুল সংশোধনের বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।

তিনি আরও বলেন, নিয়মিত ইস্তিগফার, নিজের ভুল সম্পর্কে সচেতনতা এবং আচরণ সংশোধনের প্রচেষ্টা মানুষকে নিজের কাজ পর্যালোচনা করতে ও আধ্যাত্মিক আত্মসচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করে। একজন মুমিনের আল্লাহর রহমতের প্রতি আশাবাদী থাকার পাশাপাশি নিজের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের জন্য দায়িত্বশীল হওয়াও জরুরি।

প্রবৃত্তির বিরোধিতা-আত্মগঠনের জন্য অপরিহার্য

বক্তব্যের অন্য অংশে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আলিজাদে প্রবৃত্তির চাহিদা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, প্রবৃত্তির ইচ্ছার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ধীরে ধীরে মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ইচ্ছাশক্তি ও আত্মসংযম শক্তিশালী করার জন্য কখনো কখনো অপ্রয়োজনীয় কিছু চাহিদার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। তবে এর অর্থ স্বাভাবিক ও বৈধ চাহিদা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা নয়; বরং জীবনে অনুচিত প্রবৃত্তির আধিপত্য বিস্তার রোধ করাই এর উদ্দেশ্য।

পরিশেষে সারায়ানের জাফরিয়া হাওজা ইলমিয়ার পরিচালক নিজের প্রবৃত্তির প্রতি নিয়মিত সতর্ক থাকা এবং আচরণ সংশোধনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পবিত্র কোরআন ও আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষার বাস্তব অনুসরণের মাধ্যমে সমাজে আধ্যাত্মিক বিকাশ এবং আল্লাহর দাসত্বের পথে অগ্রসর হওয়ার পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha