সোমবার ১০ মার্চ ২০২৫ - ২২:৪৯
খাদিজাতুল কুবরা (সা.): ইসলামের প্রথম মহীয়সী নারী

বিবি খাদিজা (সা.) শুধু রাসূল (সা.)-এর স্ত্রীই ছিলেন না, বরং তিনি ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও মহীয়সী নারী ছিলেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ নারীরা চারজন: মরিয়ম বিনতে ইমরান, আসিয়া বিনতে মুজাহিম (ফিরআউনের স্ত্রী), খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ এবং ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ।"
(সূত্র: আহমদ ইবনে হাম্বল, হাদিস নং ১১১৩; তিরমিজি, হাদিস নং ৩৮৭৮)

এই হাদিস প্রমাণ করে যে, বিবি খাদিজা (সা.) শুধু রাসূল (সা.)-এর স্ত্রীই ছিলেন না, বরং তিনি ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও মহীয়সী নারী ছিলেন। তাঁর আত্মত্যাগ ও খিদমত ইসলামের প্রথম যুগে অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে।

ভূমিকা:
বিবি খাদিজাতুল কুবরা (সালামুল্লাহি আলাইহা) শুধু রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রীই ছিলেন না, বরং ইসলামের প্রথম এবং অন্যতম প্রধান সহায়তাকারী ছিলেন। তাঁর অপরিসীম ত্যাগ ও খিদমতের কারণেই ইসলাম তার প্রাথমিক পর্যায়ে টিকে থাকতে সক্ষম হয়। তিনি ১০ রমজান, নবুওয়াতের দশম বছরে ইন্তেকাল করেন, যা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য এক গভীর শোকের মুহূর্ত ছিল। এই বছরকে ‘আমুল হুজন’ বা ‘দুঃখের বছর’ বলা হয়, কারণ একই বছরে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রিয় চাচা আবু তালিব (আ.)-কেও হারান।

হযরত খাদিজাতুল কুবরা (সা.)-এর বংশ পরিচয়:
হযরত খাদিজা (সালামুল্লাহি আলাইহা) ছিলেন কুরাইশ বংশের একজন সম্মানিত ও উচ্চ মর্যাদার নারী। তাঁর পিতৃ ও মাতৃ উভয় দিক থেকে বংশীয় মর্যাদা অত্যন্ত সমুন্নত ছিল।

পিতৃপরিচয়:
নাম: খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (خديجة بنت خويلد)
পিতা: খুয়াইলিদ ইবনে আসাদ (خويلد بن أسد)
পিতামহ: আসাদ ইবনে আবদুল উজ্জা (أسد بن عبد العزى)
পিতৃপরিবার: কুরাইশ গোত্রের আসাদ বংশ।

 মাতৃপরিচয়:
মাতা: ফাতিমা বিনতে যায়দাহ (فاطمة بنت زائدة)
মাতামহ: যায়দাহ ইবনে আসাম (زائدة بن الأصم)
মাতৃপরিবার: আমির ইবনে লুয়াই বংশ, যা কুরাইশদের অন্যতম সম্মানিত শাখা

বংশধারা ও নবী (সা.)-এর সাথে সম্পর্ক:
বিবি খাদিজা (সা.)-এর বংশধারা নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর বংশের সঙ্গে মিলে যায় কিলাব ইবনে মুররাহ (كلاب بن مرة)-তে। অর্থাৎ, উভয়ের পূর্বপুরুষ কিলাব ইবনে মুররাহ ছিলেন, যিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চতুর্থ পুরুষ পূর্বপুরুষ ছিলেন।

বংশগত মর্যাদা ও খ্যাতি:
বিবি খাদিজা (সা.) ছিলেন মক্কার ধনী, সম্মানিত ও প্রভাবশালী নারী।তাঁর পিতা খুয়াইলিদ ইবনে আসাদ ছিলেন কুরাইশ গোত্রের একজন বিখ্যাত নেতা এবং বীর যোদ্ধা।তাঁর পরিবার ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল এবং আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁদের সুনাম ছিল।

ইসলামের প্রচারে বিবি খাদিজা (সা.)-এর অবদান:

১. সর্বপ্রথম ঈমান গ্রহণকারী ব্যক্তি:
নবুয়তের সূচনায়, যখন নবী মুহাম্মাদ (সা.) গুহা হেরাতে প্রথম ওহি লাভ করেন, তখন তিনি শঙ্কিত অনুভব করেন। তিনি যখন ঘটনাটি বিবি খাদিজার (সা.) নিকট বর্ণনা করেন, তখন তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি নির্দ্বিধায় নবীজির (সা.) ওপর ঈমান আনেন এবং ইসলামের সত্যতা স্বীকার করেন। এই সমর্থন নবুওয়াতের শুরুর দিকে রাসূল (সা.)-এর মনোবল দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২. সম্পদ ও অর্থ দিয়ে ইসলামের জন্য সহযোগিতা:
বিবি খাদিজা (সা.) ছিলেন মক্কার একজন ধনী ও সম্মানিত ব্যবসায়ী। তিনি তাঁর সম্পদ ইসলামের প্রচার এবং নবী (সা.)-এর ওপর আসা প্রতিটি বিপদ মোকাবিলার জন্য ব্যয় করেন।রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতের জন্য তিনি তাঁর সমস্ত সম্পদ উৎসর্গ করেন।
শুরুর দিকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং কুরাইশদের অত্যাচারের শিকার হয়েছিল, তাদের জন্য তিনি আশ্রয় ও সাহায্যের ব্যবস্থা করেন।

নবী (সা.) যখন তিন বছর ধরে শিবে আবি তালিবে অবরুদ্ধ ছিলেন, তখন তিনি তাঁর সম্পদ দিয়ে মুসলমানদের খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করেন।
ইমাম আলী (আ.) বলেন:
"খাদিজা (সা.) এমন নারী ছিলেন, যিনি নিজের সমস্ত সম্পদ ইসলামের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি মুসলিম নারীদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।"
(সূত্র: নাহজুল বালাগা, চিঠি ৩১)

৩. মানসিক ও নৈতিক সমর্থন:
প্রথম ওহি লাভের পর নবী (সা.) গুহা হেরা থেকে ভীত ও উদ্বিগ্ন অবস্থায় ফিরে এসে বলেছিলেন, "আমি নিজের জন্য শঙ্কিত বোধ করছি।"

তখন বিবি খাদিজা (সা.) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন:
"না! (ভয় পাবেন না), আল্লাহ কখনো আপনাকে অপমান করবেন না। কারণ, আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, দুর্বলদের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বদের সাহায্য করেন, অতিথিপরায়ণতা করেন এবং ন্যায়ের পথে মানুষের পাশে দাঁড়ান।"

(সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬০)

বিবি খাদিজা (সা.)-এর এই আশ্বাস রাসূল (সা.)-এর মনোবল দৃঢ় করে এবং তিনি নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।

৪. সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে সংগ্রাম:
মক্কার কাফেররা যখন নবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল, তখন বিবি খাদিজা (সা.) প্রকাশ্যে রাসূল (সা.)-এর প্রতি তাঁর সমর্থন ঘোষণা করেন। তিনি ভয় না পেয়ে নবীর পাশে দাঁড়িয়ে ইসলামের বার্তা প্রচারে সাহায্য করেন।
ইমাম হাসান (আ.) বলেন:
"আমার দাদী খাদিজা (সা.) হলেন সেই মহীয়সী নারী, যাঁর ইমানের দৃঢ়তা এবং আত্মত্যাগের কারণে ইসলাম শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পেরেছে।"
(সূত্র: বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৪৩, পৃষ্ঠা ১৩১)

৫. রাসূল (সা.)-এর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে বিবি খাদিজা (সা.)-এর স্থান ছিল অনন্য। তিনি অন্য কোনো স্ত্রীকে বিবি খাদিজার (সা.) সমতুল্য ভাবেননি।তাঁর মৃত্যুর পরও রাসূল (সা.) তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতেন এবং তাঁর নামে সদকা করতেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"খাদিজা যখন সবাই আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তখন তিনি আমাকে গ্রহণ করেছিলেন। যখন সবাই আমাকে বঞ্চিত করেছিল, তখন তিনি আমাকে তাঁর সহায়তা দিয়েছিলেন।"

উপসংহার:
বিবি খাদিজাতুল কুবরা (সা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী। তাঁর আত্মত্যাগ, ধৈর্য, ভালোবাসা ও অক্লান্ত সহযোগিতা ইসলামের ভিত্তি মজবুত করেছিল। এজন্যই তাঁকে ‘উম্মুল মু’মিনিন’ বা ‘মুমিনদের জননী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। তাঁর জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত—বিশ্বাস, আত্মত্যাগ ও মানবসেবায় নিজেকে নিবেদিত করার।

লেখক: কবির আলী তরফদার কুম্মী।
তারিখ:১০/০৩/২০২৫

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha