রবিবার ২৪ আগস্ট ২০২৫ - ১০:২৪
ইমাম রেজা (আ.)-এর জীবন ও ইমামতকালীন আটটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর

ইসলামের ইতিহাসে ইমাম রেজা (আ.)-এর ইমামতকাল এক অনন্য অধ্যায়। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, শাসকদের চতুর কৌশল, বিদ্রোহ ও মতভেদ—সবকিছুর ভেতরেও তিনি আহলে বাইতের শিক্ষা, তাওহিদের সত্য এবং শিয়া মতাদর্শকে এমনভাবে প্রচার করেছিলেন, যা যুগের পর যুগ মুসলিম সমাজে আলোকবর্তিকা হয়ে আছে। তাঁর জীবন ছিল একদিকে গভীর আধ্যাত্মিকতার প্রতিচ্ছবি, অন্যদিকে কঠোর রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আব্বাসীয় শাসক মামুন, যিনি নিজের ভাই আমিনকে পরাজিত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন, খুব দ্রুত বুঝতে পারেন যে শিয়া আন্দোলনকে সরাসরি দমন করা সহজ নয়। তাই তিনি অন্য খলিফাদের থেকে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন—ইমাম রেজা (আ.)-কে মার্ভে ডেকে এনে ওয়ালিয়ে আহাদ (রাজ্য উত্তরসূরী) করার প্রস্তাব দেন। ইতিহাসের পাঠে দেখা যায়, এটি ছিল এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চাল, যা ইমাম রেজা (আ.)-এর প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার কারণে বরং আব্বাসিদের জন্য উল্টোফল বয়ে আনে।

ইমাম রেজা (আ.)-এর শাহাদাত বার্ষিকীতে তাঁর জীবন ও ইমামতের আটটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন এক: কেন মামুন ইমাম রেজা (আ.)-কে মারভে ডাকার ব্যাপারে জোর দিয়েছিল?

১৯৮ হিজরিতে নিজের ভাই আমিনকে পরাজিত করার পর মামুন আব্বাসি আলাভিদের সমস্যা সমাধান ও শিয়াদের আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের জন্য পূর্ববর্তী খলিফাদের থেকে ভিন্ন কৌশল নেয়। সরাসরি দমন বা তাদের আন্দোলন সীমাবদ্ধতা করার পরিবর্তে তিনি ইমাম রেজা (আ.)-কে ওালিয়য়ে আহাদ হওয়ার প্রস্তাব দেন।
তার প্রধান উদ্দেশ্যগুলো ছিল:

শিয়া আন্দোলনকে নিস্তেজ করা: ইমামকে ক্ষমতার কাঠামোর অংশ করে শিয়াদের বিপ্লবী সংগ্রামকে কম বিপজ্জনক ও আনুষ্ঠানিক রূপে পরিণত করা।

শিয়াদের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা: ইমাম যদি ওয়ালিয়ে আহাদ গ্রহণ করেন, তবে তা খলাফতে আব্বাসিকে পরোক্ষভাবে সমর্থন ও শিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গি খণ্ডনের সমান হতো।

ইমামের উপর সর্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ: খিলাফতের কাঠামোর মধ্যে ইমাম থাকলে সহজেই তাঁকে পর্যবেক্ষণ করা যেত এবং অন্যান্য শিয়া নেতাদেরও সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হতো।

ইমামের জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করা: দরবারে অবস্থান মানেই জনসাধারণ থেকে দূরে রাখা এবং তাঁর প্রভাব হ্রাস করা।

নিজের জন্য ধর্মীয় বৈধতা অর্জন: একজন নিষ্কলুষ ইমামকে উত্তরাধিকারী হিসেবে নিযুক্ত করলে মামুনের শাসন ধর্মীয় মর্যাদা পেত।

ইমামকে খলাফতের সমর্থক বানানো: ইমামের জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বকে ব্যবহার করে নিজের নীতি ও কর্মকাণ্ডকে বৈধ প্রমাণ করা।

প্রশ্ন দুই: মামুনের ওয়ালিয়ে আহাদের প্রস্তাবের প্রতি ইমাম রেজা (আ.)-এর প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

ইমাম রেজা (আ.) যখন মদিনা থেকে খোরাসানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, তিনি স্পষ্টভাবে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। বিদায়ের সময় তিনি রাসুল (সা.), কাবা ও পরিবারকে চোখের জলে শেষ বিদায় জানান, যা তাঁর আসন্ন শাহাদাত সম্পর্কে পূর্বজ্ঞানকে প্রকাশ করে।

মার্ভে পৌঁছার পর মামুন যখন ওয়ালিয়ে আহাদের প্রস্তাব দেন, ইমাম তীব্রভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু মৃত্যুর হুমকির মুখে তিনি বিকল্প কৌশল হিসেবে তা গ্রহণ করতে বাধ্য হন। ইমাম সর্বত্র ঘোষণা দেন যে এটি জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ইমাম শর্ত দিয়েছিলেন যে, তিনি কোনো শাসনকার্যে হস্তক্ষেপ করবেন না। মামুন বাহ্যিকভাবে এ শর্ত মেনে নিলেও বাস্তবে তা ভঙ্গ করার চেষ্টা করেছিল।

ইমাম ওয়ালিয়ে আহাদের পদে থেকেও সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সমালোচনামূলক অবস্থান বজায় রাখেন। এই সুযোগে তিনি শিয়া ইমামতের সত্যকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন এবং দীর্ঘদিনের তাকিয়া ভেঙে আহলে বাইতের শিক্ষাকে সারা ইসলামি বিশ্বে উন্মুক্ত করেন।

প্রশ্ন তিন: কেন মামুন কালো পতাকা বদলে সবুজ পতাকা গ্রহণ করেছিলেন?

২০১ হিজরিতে ইমাম রেজা (আ.)-কে ওয়ালিয়ে আহাদ ঘোষণার সময় মামুন সরকারি পতাকা ও পোশাকের রঙ কালো থেকে সবুজে পরিবর্তন করেন। কালো ছিল আব্বাসিদের প্রতীক, আর সবুজ আহলে বাইতের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতীক।

এটি মূলত শিয়াদের আস্থা অর্জনের এক প্রচেষ্টা ছিল। তবে আব্বাসি পরিবার এতে তীব্র আপত্তি জানায় এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। ফলে পরে বাগদাদে ফিরে মামুন আবার কালো রঙ ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হন।

এই ঘটনা প্রমাণ করে, মামুন ধর্মীয় প্রতীককে কেবল রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছিল।

প্রশ্ন চার: মামুন কি শিয়া ছিল?

মামুন ছিলেন জটিল ও দ্বিমুখী ব্যক্তিত্ব। শহীদ মুতাহহারি বলেন, তিনি শিয়া মাযহাবের অনুসারী না হলেও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে শিয়াদের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। কারণ তিনি জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী ছিলেন এবং শিয়ারা যুক্তি ও প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দিত।
কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন, মামুন ইমাম আলী (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী ছিলেন, তবে এটি শুধু মতামত ছিল, পূর্ণ আনুগত্য নয়।
তিনি যেমন শিয়া ফকিহদের সভা আয়োজন করেছিলেন এবং আলী (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছিলেন, তেমনিভাবে শিয়াদের প্রশাসনিক দায়িত্বও দিয়েছিলেন। কিন্তু সবকিছুই ছিল রাজনৈতিক বৈধতা রক্ষার উদ্দেশ্যে।

প্রশ্ন পাঁচ: ইমাম জাওয়াদ (আ.) কি ইমাম রেজা (আ.)-এর একমাত্র সন্তান ছিলেন?

শেখ মুফিদ, ইবন শাহার আসূব ও তাবরসি প্রমুখের মত আলেমরা একমত যে ইমাম রেজা (আ.)-এর একমাত্র সন্তান ছিলেন ইমাম জাওয়াদ (আ.)।

তবে কিছু ইতিহাসবিদ আরও কয়েক সন্তানের নাম উল্লেখ করেছেন, যেমন—হাসান, জাফর, ইব্রাহিম ও ফাতিমা।

তবুও অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য শিয়া সূত্র অনুযায়ী ইমাম রেজা (আ.)-এর শাহাদাতের পর জীবিত ছিলেন কেবল ইমাম জাওয়াদ (আ.)। এমনকি ইমাম রেজা (আ.) নিজেও বলেছেন, “আমার একটি ছাড়া আর সন্তান থাকবে না।”

প্রশ্ন ছয়: ইমাম রেজা (আ.)-এর সময়ে যারা ‘আলাভি’ নামে বিদ্রোহ করেছিল, তারা কারা?

এখানে আলাভি বলতে মূলত হাসানি সাদাত ও কিছু আলাভি বংশীয় নেতাকে বোঝানো হয়, যারা আব্বাসিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। তারা সবাই ইমামি শিয়া ছিলেন না; বরং অনেকেই ছিলেন জায়েদি মতাবলম্বী।
তাদের সেনাবাহিনীও কেবল ধর্মীয় ভিত্তিতে গঠিত ছিল না, বরং বিভিন্ন ধরনের মানুষ যুক্ত হয়েছিল। যেমন—ইমাম রেজা (আ.)-এর ভাই যায়েদ-উন্-নার বসরায় বিদ্রোহ করেন এবং মানুষের ঘরবাড়ি আগুনে পোড়ানোর কারণে এই উপাধি পান। তাঁর কাজকে ইমাম রেজা (আ.) তীব্রভাবে নিন্দা করেছিলেন।

অতএব, ইতিহাসে যে আলাভিদের বিদ্রোহের উল্লেখ আছে, তা ছিল স্বাধীন আন্দোলন, ইমাম রেজা (আ.)-এর নেতৃত্বাধীন ইমামি শিয়াদের আন্দোলন নয়।

প্রশ্ন সাত: ইমাম রেজা (আ.)-এর সময়ে মার্ভ ও খোরাসানের মানুষ কোন মাযহাবের অনুসারী ছিল?

ইমাম রেজা (আ.) যখন মার্ভে আসেন, তখন অধিকাংশ মানুষ ছিলেন সুন্নি, বিশেষ করে হানাফি বা অন্যান্য সুন্নি মাযহাবের অনুসারী। শিয়া মতবাদ তখনো ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল না। আব্বাসিদের শাসন সুন্নি মাযহাবকে সমর্থন করত এবং শিয়াদের প্রভাব সীমিত করত।

ইমাম রেজা (আ.)-এর আগমন ছিল এক ঐতিহাসিক মোড়। তিনি আলোচনাসভা, ইলমি বিতর্ক ও দাওয়াতের মাধ্যমে আহলে বাইতের শিক্ষাকে জনসমক্ষে তুলে ধরেন। এতে মানুষ শিয়া মাজহাবের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং মার্ভে শিয়া শিক্ষার কেন্দ্র গড়ে ওঠে। তাঁর আগমনই খোরাসানে শিয়া মতবাদের বিকাশের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রশ্ন আট: কেন ইমাম রেজা (আ.)-এর বিখ্যাত হাদিসকে «সিলসিলাতুয-যাহাব» (সোনার শৃঙ্খল) বলা হয়?

«সিলসিলাতুয-যাহাব» হলো তাওহিদ ও তার শর্তাবলী বিষয়ে একটি হাদিস, যা ইমাম রেজা (আ.) নিশাপুরে যাত্রাবিরতির সময় বর্ণনা করেন।

এই হাদিসে বর্ণনাকারীদের পুরো সিলসিলা (শৃঙ্খল) আহলে বাইতের ইমামগণ। অর্থাৎ ইমাম রেজা (আ.) → ইমাম কাজিম (আ.) → ইমাম সাদিক (আ.) → … → ইমাম আলী (আ.) → রাসুল (সা.) → আল্লাহ।
তাই এটিকে «সিলসিলাতুয-যাহাব» অর্থাৎ সোনার শৃঙ্খল বলা হয়।
নিশাপুরে এই হাদিস শোনার সময় বিশ হাজারেরও বেশি মানুষ তা লিখে নিয়েছিল বলে উল্লেখ আছে।

সূত্র:

১. তারিখ-এ তামাদ্দুন-এ ইসলাম, খন্ড- ১, পৃষ্ঠা- ১৪০

২. কাশফুল গাম্মাহ, পৃষ্ঠা- ৩০২

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha