সোমবার ২৫ আগস্ট ২০২৫ - ০৮:২৪
লাইলাতুল মাবিত: রাসুলুল্লাহ (সা.) ও ইসলামের জন্য ইমাম আলী (আ.)-এর আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত

ইসলামের ইতিহাসে লাইলাতুল মাবিত একটি বিশেষ রাত, যা হিজরতের পূর্বরাত্রি অর্থাৎ রবি‘উল আউয়ালের প্রথম রাতে সংঘটিত হয়। এ রাতে ইমাম আলী (আ.) মহান ত্যাগের পরিচয় দিয়ে নবীজী (সা.)-এর শয্যায় শুয়ে পড়েন, যাতে মুশরিকদের হত্যার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয় এবং নবী (সা.) নিরাপদে মদিনায় হিজরত করতে পারেন। এই ঘটনা নবীর প্রতি আনুগত্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মত্যাগের সর্বোত্তম উদাহরণ হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: এই রাতে নবীজীর (সা.) জীবন রক্ষা ও স্থায়িত্বের জন্য আমিরুল মু'মিনিন ইমাম আলী (আ.) রাসুলের (সা.) প্রতি আনুগত্য  আত্মত্যাগের এক চিরন্তন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

মুশরিকদের ষড়যন্ত্র
কুরাইশের নেতারা দারুন নাদওয়া-তে বৈঠকে বসে নবীজীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)'কে  বন্দি করা বা নির্বাসন দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে, তারা চূড়ান্তভাবে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি গোত্রের তরুণরা একযোগে নবীজীর ঘরে হানা দিয়ে তাঁকে হত্যা করবে, যাতে রক্তের দায় সকল গোত্রে বিভক্ত হয় এবং বনি হাশিম গোত্র একা প্রতিশোধ নিতে না পারে।

ইমাম আলী (আ.)-এর ত্যাগ
আল্লাহর নির্দেশে নবীজী (সা.) মক্কা ত্যাগ করে মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তিনি ইমাম আলী (আ.)-কে বিষয়টি জানিয়ে বলেন যাতে তিনি তাঁর শয্যায় শুয়ে শত্রুদের বিভ্রান্ত করেন। ইমাম আলী (আ.) বিনা দ্বিধায় এবং আনন্দচিত্তে এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন, নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে নবীজীর (সা.) নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) তখন সূরা ইয়াসিনের ৯ নং আয়াত পাঠ করতে করতে শত্রুদের চোখ এড়িয়ে বেরিয়ে গার সাওরের গুহায় যান:

وَجَعَلْنَا مِن بَیْنِ أَیْدِیهِمْ سَدًّا وَمِنْ خَلْفِهِمْ سَدًّا فَأَغْشَیْنَاهُمْ فَهُمْ لَا یُبْصِرُونَ

আমরা তাদের সামনেও দেয়াল স্থাপন করেছি, পেছনেও দেয়াল; ফলে তারা কিছুই দেখতে পায় না।

পরের সকালে মুশরিকরা বাড়ি ঘিরে হানা দিলে বিস্ময়ে দেখতে পায় শয্যায় নবী (সা.) নন, বরং ইমাম আলী (আ.) শুয়ে আছেন। তিনি শান্তভাবে উত্তর দেন: “রসুলুল্লাহ কোথায় আছেন, আমি জানি না।”

আয়াত নাজিল হওয়া
এই ত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ আল্লাহ তাআলা সূরা বাকারা, আয়াত ২০৭ নাজিল করেন:

وَمِنَ النَّاسِ مَن یَشْرِی نَفْسَهُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ رَءُوفٌ بِالْعِبَادِ

মানুষের মধ্যে এমনও রয়েছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে। আর আল্লাহ বান্দাদের প্রতি দয়ালু।

শিয়া মুফাস্সিরগণ এবং বহু আহলে সুন্নাহর আলেম একমত যে, এই আয়াত ইমাম আলী (আ.)-এর লাইলাতুল মাবিতের ফিদায়ী ত্যাগকে সম্মানিত করার জন্য নাজিল হয়েছে।

আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
লাইলাতুল মাবিত কেবল একটি কৌশলগত পদক্ষেপ ছিল না, বরং ঈমান, আত্মত্যাগ এবং নবীর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মহাপরীক্ষা। ইমাম আলী (আ.) সচেতনভাবে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেন, ইসলামের সংরক্ষণ এবং নবীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। এ কর্ম চিরকাল ইতিহাসে নবীপ্রেম ও আল্লাহর সন্তুষ্টির সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha