শুক্রবার ১০ এপ্রিল ২০২৬ - ০৩:৫২
জনগণের মাঠে উপস্থিতি অব্যাহত রাখতে হবে; হামলাকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে, হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনায় নতুন পর্যায়

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা হুসাইনি খামেনেয়ী বলেছেন, সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের জনগণের ঐক্যবদ্ধ উপস্থিতি ও প্রতিরোধ দেশকে নতুন শক্তির অবস্থানে নিয়ে গেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের ওপর হামলা চালানো শক্তিগুলোকে অবশ্যই তাদের অপরাধের মূল্য দিতে হবে এবং সব ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ৯ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন। বিপ্লবী নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.)-এর শাহাদাতের চল্লিশতম দিবস উপলক্ষে দেওয়া এই বার্তায় তিনি সাম্প্রতিক সংঘাতকে “তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধ” হিসেবে উল্লেখ করেন।

শহীদ নেতার স্মরণ
বার্তার শুরুতে আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনেয়ী বলেন, চল্লিশ দিন আগে ইরান ও ইসলামের শত্রুরা এক বড় অপরাধ সংঘটিত করেছে এবং এর ফলে ইরান তার এক মহান বিপ্লবী নেতাকে হারিয়েছে। তিনি শহীদ নেতাকে ইরানি জাতির পথপ্রদর্শক এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টের একজন গুরুত্বপূর্ণ শহীদ নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন, গত কয়েক সপ্তাহের সংঘাতে বহু কমান্ডার, যোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষ—শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত—শাহাদাত বরণ করেছেন। তাদের রক্ত ইরানের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

নেতৃত্বের অবদান
আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনেয়ী বলেন, শহীদ নেতা ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি আধ্যাত্মিকতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং সংগ্রামী চেতনার সমন্বয়ে জাতিকে পরিচালিত করেছেন।

তার ভাষায়, জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা, জনগণকে বিপ্লবের আদর্শে সংগঠিত করা, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি করা—এসব ক্ষেত্রেই তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

“তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধে” প্রতিরোধ
বার্তায় আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনেয়ী বলেন, শত্রুরা ভেবেছিল এই আক্রমণের মাধ্যমে তারা ইরানকে দুর্বল করবে। কিন্তু বাস্তবে ইরানের জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর দৃঢ় প্রতিরোধ পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে নিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগ, জনগণের সমর্থন এবং প্রতিরোধ শক্তির দৃঢ় অবস্থানের ফলে ইরান আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

জনগণের উপস্থিতির গুরুত্ব
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, গত চল্লিশ দিনে যেভাবে জনগণ রাস্তায়, মহল্লায় এবং সামাজিক অঙ্গনে সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রেখেছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, “এই উপস্থিতি অব্যাহত রাখতে হবে।” এমনকি যদি সংঘাতে সাময়িক বিরতি বা আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়, তবুও জনগণের মাঠে উপস্থিতি কমে যাওয়া উচিত নয়।

প্রতিরোধ অক্ষের প্রতি পূর্ণ সমর্থন
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা হুসাইনি খামেনেয়ী তার বার্তায় বলেন, ইরান যুদ্ধ চায় না; তবে নিজের ন্যায্য অধিকার থেকে কখনও সরে দাঁড়াবে না। তিনি বলেন, দেশের ওপর আক্রমণকারী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে এবং জাতির অধিকার রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।

তিনি আরও বলেন, ইরান তার অধিকার আদায়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় পুরো প্রতিরোধ অক্ষকে একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। তার ভাষায়, এই সংগ্রামে আঞ্চলিক প্রতিরোধ শক্তিগুলোকে একক ও সমন্বিত বাস্তবতা হিসেবে দেখা হয়।

আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনেয়ী বলেন, ইরান যুদ্ধের পক্ষপাতী নয়, কিন্তু দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ন্যায্য অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থানে থাকবে। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিরোধ অক্ষের ঐক্য এবং সমন্বয়কে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।

দক্ষিণের প্রতিবেশীদের উদ্দেশে বার্তা
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর উদ্দেশে আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনেয়ী বলেন, তারা বর্তমানে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সাক্ষী।

তিনি বলেন, “আপনারা একটি অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করছেন। তাই শয়তানের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করবেন না।”

তিনি আরও বলেন, ইরান এখনও তার দক্ষিণের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে একটি সঠিক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। তারা যদি সঠিক অবস্থান গ্রহণ করে, তবে ইরান তাদের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে।

ক্ষতিপূরণ ও হরমুজ প্রণালী
বার্তায় আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনেয়ী স্পষ্টভাবে বলেন, ইরানের ওপর হামলা চালানো শক্তিগুলোকে কোনোভাবেই ছেড়ে দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, “শহীদদের রক্ত, আহতদের কষ্ট এবং যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে—সবকিছুর ক্ষতিপূরণ অবশ্যই আদায় করা হবে।”

একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন যে হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনা এখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করবে—যা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

ঐক্যের আহ্বান
বার্তার শেষাংশে তিনি ইরানের জনগণকে ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সংকটের সময় পারস্পরিক সহযোগিতা ও ধৈর্য জাতির শক্তিকে আরও দৃঢ় করে।

তিনি আরও বলেন, শত্রুপক্ষের প্রচারণা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ঐক্য অটুট রাখতে হবে।

সবশেষে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ চায় না; তবে নিজের অধিকার, সার্বভৌমত্ব এবং প্রতিরোধের নীতির ক্ষেত্রে কোনো আপস করবে না।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha