হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, কোমে শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর চিন্তাধারা ও জিহাদি কর্মকাণ্ডবিষয়ক সম্মেলনের প্রাক-আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে আয়াতুল্লাহ তাবাসি লেখক, গবেষক, আলেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান, তাঁরা যেন নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী শহীদ নাসরুল্লাহর জীবন, চিন্তাধারা ও অবদান বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বাধা ও প্রচারণার কারণে অনেক সময় প্রতিরোধ আন্দোলনের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না। তাই শহীদ নাসরুল্লাহর জীবন ও কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা, লেখালেখি, অনুবাদ এবং তথ্যভিত্তিক প্রকাশনার মাধ্যমে তাঁর অবদান সংরক্ষণ করা জরুরি।

শহীদ নাসরুল্লাহর বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় অধ্যয়ন
আয়াতুল্লাহ তাবাসি জানান, শহীদ নাসরুল্লাহর সঙ্গে তাঁর বহু বছরের বৈজ্ঞানিক ও গবেষণামূলক যোগাযোগ ছিল। বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের ব্যস্ততার মধ্যেও নাসরুল্লাহ নিয়মিত অধ্যয়ন ও জ্ঞানচর্চায় সময় দিতেন। বিশেষ করে মাহদাভিয়াত বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল অত্যন্ত গভীর।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, কখনো কখনো মহররম মাসে বক্তৃতা ও অন্যান্য কর্মসূচি শেষ করার পরও শহীদ নাসরুল্লাহ গভীর রাত পর্যন্ত ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা চালিয়ে যেতেন। ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাব, তাঁর সঙ্গীদের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলো নিয়ে তিনি বিশেষ আগ্রহের সঙ্গে আলোচনা করতেন।
তাবাসি আরও জানান, শহীদ নাসরুল্লাহ তাঁর কাছে দুটি বিশেষ গবেষণার অনুরোধ করেছিলেন। প্রথমটি ছিল ইহুদি জনগোষ্ঠী ও ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে মাহদাভিয়াত-সম্পর্কিত রেওয়ায়েতগুলোর পর্যালোচনা। দ্বিতীয়টি ছিল ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের আগে আব্বাসীয় শাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলোর সনদ ও বক্তব্যের তাৎপর্য বিশ্লেষণ। এসব গবেষণার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে গ্রন্থও প্রণীত হয়।

আহলে বাইত (আ.) ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা
আয়াতুল্লাহ তাবাসির ভাষ্য অনুযায়ী, শহীদ নাসরুল্লাহ আহলে বাইত (আ.), বিশেষ করে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি গভীর অনুরাগ পোষণ করতেন। কারবালার ঘটনা ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শোকগাথা বর্ণিত হলে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন।
তাবাসি বলেন, লেবাননে আশুরা ও মহররমের শোকানুষ্ঠান বিস্তারে শহীদ নাসরুল্লাহ ও হিজবুল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর উদ্যোগে মহররম মাসে প্রায় এক হাজার শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর দাহিয়ায় আশুরার অনুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নিতেন।
তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা-হুমকি ও বিভিন্ন বাধা সত্ত্বেও শহীদ নাসরুল্লাহ ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতেন। পাশাপাশি ধর্মীয় প্রচারক তৈরি এবং সমাজের নারী-পুরুষ ও বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিও তাঁর মনোযোগ ছিল।
ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র ও নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ
আয়াতুল্লাহ তাবাসি বলেন, শহীদ নাসরুল্লাহর কর্মকাণ্ড শুধু রাজনৈতিক ও সামরিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন এবং তরুণ প্রজন্মকে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করতেন।
তাঁর মতে, নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত করা, তরুণদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও সামাজিক দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করা এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে শহীদ নাসরুল্লাহ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন।

ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক
তাবাসি আরও বলেন, শহীদ নাসরুল্লাহর সঙ্গে ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীর সম্পর্ক ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতাপূর্ণ। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তেহরানে খামেনেয়ীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় নাসরুল্লাহ তাঁর হাত চুম্বন করেন। পরে তিনি এ আচরণের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, নিজের অর্জন ও অবস্থানের পেছনে তিনি খামেনেয়ীর দিকনির্দেশনাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন।
তাবাসি আরও উল্লেখ করেন, শহীদ নাসরুল্লাহ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অবস্থান নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত থাকতেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।
শহীদ নাসরুল্লাহর উত্তরাধিকার সংরক্ষণের আহ্বান
আয়াতুল্লাহ তাবাসি বলেন, শহীদ নাসরুল্লাহর জীবন ও অবদানকে কেবল রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। তাঁর বৈজ্ঞানিক, ধর্মীয়, নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অবদানও যথাযথভাবে গবেষণা ও নথিবদ্ধ করা প্রয়োজন।
তিনি সংশ্লিষ্ট আলেম, গবেষক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাঁর জীবন, চিন্তাধারা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বকোষ প্রণয়নের আহ্বান জানান। পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষায় বই প্রকাশ, তথ্যচিত্র নির্মাণ, গবেষণাপত্র অনুবাদ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রচারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শহীদ নাসরুল্লাহর চিন্তাধারা, ধর্মীয় অধ্যয়ন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাপ্রবাহে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে আরও বিস্তৃত ধারণা লাভ করতে পারবে।
আপনার কমেন্ট