হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, পবিত্র মাজারের ইমাম খোমেনি (রহ.) প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি জীবনের প্রতিকূলতা মোকাবিলায় একত্ববাদী বিশ্বাসের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং তাঁর অসীম ক্ষমতার ওপর ভরসা মানুষের জীবনে প্রশান্তি, আশা ও দৃঢ়তা বজায় রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস: কঠিন পরিস্থিতিতে অবিচল থাকার শক্তি
হুজ্জাতুল ইসলাম জুশকানিয়ান নবী-রাসুল ও আল্লাহর ওলিদের জীবন, পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধের যোদ্ধা এবং শহীদদের আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করে বলেন, যাঁরা গভীর ঈমান ও আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে জীবনযাপন করেন, তাঁরা বিপদ-আপদ ও প্রতিকূলতার মুখে সহজে হতাশ হয়ে পড়েন না। কারণ, তাঁরা পরিস্থিতি মূল্যায়নের সময় পার্থিব উপায়-উপকরণের পাশাপাশি আল্লাহর ক্ষমতা ও ইচ্ছার ওপরও আস্থা রাখেন।
তিনি হজরত মূসা (আ.)-এর সঙ্গে বনি ইসরাইলের নীল নদের সামনে উপস্থিত হওয়া এবং ফেরাউনের বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন। সে সময় হজরত মূসা (আ.)-এর সঙ্গীরা নিজেদের অবরুদ্ধ মনে করলেও তিনি আল্লাহর প্রতি আস্থা বজায় রেখেছিলেন।
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি বলেন, জীবনের সংকট মোকাবিলায় কেবল বাহ্যিক পরিস্থিতি ও বস্তুগত সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়; বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও ভরসা বজায় রাখতে হবে।
তিনি শহীদ কাসেম সোলাইমানি এবং অন্যান্য শহীদ ও যোদ্ধার আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, ঈমান, ধৈর্য, দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগের মানসিকতা সংকট অতিক্রম করতে মানুষকে শক্তি জোগায় এবং প্রতিকূলতার কারণে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করে।
স্বাচ্ছন্দ্য ও মানসিক প্রশান্তি এক নয়
বক্তব্যের আরেক অংশে জুশকানিয়ান বস্তুগত স্বাচ্ছন্দ্য ও প্রকৃত মানসিক প্রশান্তির মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বাড়ি, আসবাবপত্র ও অন্যান্য পার্থিব সম্পদ মানুষের জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে পারে। কিন্তু প্রকৃত প্রশান্তি মানুষের অন্তর, আত্মা ও হৃদয়ের অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই বস্তুগত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেলেই যে মানসিক প্রশান্তি বাড়বে, এমন নয়।
ইমাম খোমেনি (রহ.) ও শহীদ সর্বোচ্চ নেতার সরল জীবনযাপনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ প্রচুর সম্পদের অধিকারী হয়েও অন্তরের প্রশান্তি থেকে বঞ্চিত থাকতে পারেন। অন্যদিকে, যাঁরা সাধারণ জীবনযাপন করেন এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও তাঁর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা ধারণ করেন, তাঁরা অধিকতর প্রশান্তি অনুভব করতে পারেন।
প্রশান্তি ও সৌভাগ্য অর্জনের পাঁচটি উপায়
হুজ্জাতুল ইসলাম জুশকানিয়ান জীবনে প্রশান্তি ও সন্তুষ্টি অর্জনের আধ্যাত্মিক উপায় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি বর্ণনার প্রতি ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, কিছু মানুষ এমন জায়গায় সৌভাগ্য ও প্রশান্তি খোঁজেন, যেখানে তা পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে তাঁরা কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারেন না।
বক্তব্যে উল্লিখিত পাঁচটি বিষয় হলো-
১. আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য
তিনি বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রথম পথ হলো তাঁর ইবাদত ও আনুগত্য করা। মানুষের উচিত ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের ওপর নির্ভরশীলতা কিংবা পার্থিব স্বার্থের মধ্যে সন্তুষ্টি খোঁজার পরিবর্তে আল্লাহর বন্দেগির মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।
২. জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জন
জ্ঞান ও প্রকৃত প্রজ্ঞার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষের জ্ঞানচর্চা কেবল বস্তুগত চাহিদা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আত্মিক উন্নয়ন, নৈতিক মূল্যবোধ এবং আধ্যাত্মিক বিষয়ের প্রতি মনোযোগও প্রকৃত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৩. অল্পে তুষ্ট থাকা বা কনাআত
তিনি বলেন, প্রকৃত আত্মনির্ভরতা ও অন্তরের প্রাচুর্য অর্জনের অন্যতম উপায় হলো কনাআত বা অল্পে তুষ্ট থাকা এবং পার্থিব সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি পরিহার করা। কারণ, সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেলেই মানুষের অন্তরে সন্তুষ্টি নিশ্চিত হয় না।
৪. পরকালকে গুরুত্ব দেওয়া
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, স্থায়ী প্রশান্তি কেবল পার্থিব জীবনের মধ্যে খোঁজা উচিত নয়। দুনিয়া নানা ধরনের সংকট, কষ্ট ও পরীক্ষায় পরিপূর্ণ। তাই উন্নত জীবন গড়ার চেষ্টা করার পাশাপাশি পরকাল এবং নিজের কাজের পরিণতি সম্পর্কেও সচেতন থাকা প্রয়োজন।
৫. প্রবৃত্তির অন্যায় চাহিদার বিরোধিতা করা
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি প্রবৃত্তির অন্যায় চাহিদার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মানুষকে নিজের অনৈতিক প্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতেই সব সিদ্ধান্ত না নিয়ে নৈতিকতা ও আল্লাহর নির্দেশনাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
বক্তব্যের সারকথা হলো, প্রকৃত প্রশান্তি ও সৌভাগ্য কেবল বস্তুগত সম্পদ বা বাহ্যিক স্বাচ্ছন্দ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং ঈমান, আল্লাহর আনুগত্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, কনাআত, পরকালমুখিতা এবং প্রবৃত্তির অন্যায় চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও তা নিহিত রয়েছে।
আপনার কমেন্ট