মঙ্গলবার ১৩ অক্টোবর ২০২৬ - ১১:০১
জীবনের দুঃখ-কষ্ট আধ্যাত্মিক বিকাশ ও পূর্ণতা অর্জনের পথ তৈরি করে

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মুনফারেদ জীবনের দুঃখ, দুর্দশা ও নানা সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, এসব পরীক্ষা-সংকট আধ্যাত্মিক বিকাশ এবং পূর্ণতা অর্জনের সুযোগ। তাঁর মতে, মানুষ আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতা পরিহার করে আল্লাহর প্রতি দাসত্বের চেতনাকে শক্তিশালী করতে পারলে জীবনের কষ্টগুলোকে আত্মিক উন্নতি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়ে পরিণত করতে পারে।

হাওজা নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মুনফারেদ হযরত আব্দুল আজিম হাসানি (আ.)-এর মাজারে নিজের নৈতিকতা বিষয়ক পাঠদানের অধিবেশনে বক্তব্য দেন।

তিনি নামাজের গুরুত্ব ও এর আদব-কায়দা পালনের ওপর জোর দিয়ে নামাজকে ইহকাল ও পরকালের সৌভাগ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি মুমিনের হৃদয়ের মর্যাদা সম্পর্কে একটি হাদিসে কুদসির প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহর সঙ্গে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক জোরদার এবং আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতা পরিহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি বলেন, নামাজ এবং এর আদব-কায়দা মেনে চলার মাধ্যমে মানুষের জীবনে আধ্যাত্মিক প্রভাব সৃষ্টি হয়। মা-বাবার সেবা ও তাঁদের দোয়া যেমন মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে, তেমনি নামাজের আদব মেনে এবং এর প্রকৃত তাৎপর্যের প্রতি মনোযোগ দিয়ে নামাজ আদায় করলে এর প্রভাব ও বরকতও মানুষের জীবনে প্রকাশ পায়।

এই হাওজা শিক্ষক নামাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এর আদব রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, তাকবিরে তাহরিমা থেকে নামাজের সালাম পর্যন্ত প্রত্যেকটি আদব মেনে চলা এবং নামাজের আধ্যাত্মিক প্রভাবের প্রতি বিশ্বাস রাখা জরুরি। রুকু, সিজদা ও কুনুতের আদব রক্ষা এবং নামাজের প্রকৃত তাৎপর্যের প্রতি মনোযোগ মানুষকে অনাচার ও সংকট থেকে মুক্ত হতে এবং ইহকাল ও পরকালের সৌভাগ্যের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মুনফারেদ এরপর মুমিনের হৃদয়ের মর্যাদা সম্পর্কে একটি হাদিসে কুদসির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আসমান, জমিন ও ছায়াপথের বিশালতা আল্লাহর সত্তার প্রকাশ ধারণ করার পাত্র নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি ওই বর্ণনার মর্ম তুলে ধরেন, যাতে বলা হয়েছে-আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দার হৃদয়ে স্থান লাভ করেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, মুমিনের হৃদয় আল্লাহর পরিচিতি ও তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্র হতে পারে। এ ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলতে মানুষকে পার্থিব আসক্তি পরিহার করতে হবে এবং নিজের ঈমানকে শক্তিশালী করতে হবে।

এই হাওযা শিক্ষক ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা হোসেইনি খামেনেয়ীর নামাজসংক্রান্ত নির্দেশনার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে নামাজ প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি নামাজ, হিজাব, সৎকাজের আদেশ এবং হালাল-হারাম মেনে চলার বিষয়গুলো উপেক্ষা করার ব্যাপারে সতর্ক করেন।

বক্তব্যের অন্য অংশে তিনি বিশিষ্ট আরিফ ইবনে ফারিদের আধ্যাত্মিক অবস্থান ও তাঁর কবিতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে মানুষের আধ্যাত্মিক সাধনার বিভিন্ন স্তর নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহর পরিচিতি অর্জনের পথে মানুষ আল্লাহর নাম ও গুণাবলির প্রতি মনোযোগের স্তর অতিক্রম করে তাওহিদের এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে সমগ্র অস্তিত্বজগতে প্রকৃত ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে কেবল আল্লাহকেই স্বীকার করা হয়।

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মুনফারেদ বলেন, পার্থিব ক্ষমতা, রাজত্ব ও জাঁকজমক সাময়িক এবং আপেক্ষিক। তাই মানুষকে দুনিয়ার বাহ্যিক ক্ষমতা ও পদমর্যাদার মোহে পড়া উচিত নয়; বরং প্রকৃত ক্ষমতা ও মহিমা আল্লাহর মধ্যেই অনুসন্ধান করতে হবে।

তিনি নামাজ, জিয়ারতে আশুরা, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও তার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং পবিত্র স্থানগুলোতে উপস্থিত হওয়াকে আল্লাহর সঙ্গে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন।

এসব পবিত্র স্থানের মধ্যে তিনি ইমাম হুসাইন (আ.), হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ.), ইমাম রেজা (আ.), হযরত মাসুমা (সা.আ.) এবং হযরত আব্দুল আজিম হাসানি (আ.)-এর পবিত্র মাজারের কথা উল্লেখ করেন। তিনি এসব আমলে অন্তরের মনোযোগ ও আল্লাহ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন।

এই হাওযা শিক্ষক মুত্তাকিদের মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের আয়াত উল্লেখ করে বলেন:

“নিশ্চয়ই মুত্তাকিরা থাকবে জান্নাতসমূহ ও নদ-নদীর মধ্যে; সত্যের আসনে, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মহামহিম বাদশাহর সান্নিধ্যে।” (সুরা আল-কামার, ৫৪:৫৪–৫৫)

তিনি বলেন, আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য মানুষকে জীবনে তাকওয়া বৃদ্ধি করতে হবে এবং বুঝতে হবে যে প্রকৃত ও স্থায়ী জীবনের অর্থ আল্লাহর নৈকট্যের মধ্যেই নিহিত।

ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন মানবতার ধারণা প্রচারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, মানুষ যেন চিরস্থায়ী ও আধ্যাত্মিক জীবন থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। জীবনের প্রকৃত তাৎপর্যের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে কেবল ক্ষণস্থায়ী পার্থিব চাহিদা পূরণে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।

এরপর হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মুনফারেদ আধ্যাত্মিক কবিতার কিছু অংশ আবৃত্তি করে মানুষের দুঃখ-কষ্ট, দারিদ্র্য ও সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পার্থিব জীবন নানা কষ্ট ও পরীক্ষায় পরিপূর্ণ। তবে এসব পরিস্থিতি মানুষের আত্মিক বিকাশ এবং আধ্যাত্মিক পূর্ণতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

মানুষের আধ্যাত্মিক অগ্রগতির সঙ্গে সোনা পরিশোধনের প্রক্রিয়ার তুলনা করে তিনি বলেন, সোনা যেমন গঠিত ও পরিশুদ্ধ হওয়ার সময় তাপ ও আঘাতের মধ্য দিয়ে যায়, তেমনি মানুষও বিকাশ ও পূর্ণতা অর্জনের পথে নানা কষ্ট ও পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। মানুষ চাইলে এই অভিজ্ঞতাগুলোকে নিজের অস্তিত্বের প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করার কাজে লাগাতে পারে।

বক্তব্যের শেষে তিনি আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা ও আত্মপ্রদর্শনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি প্রবৃত্তির কুপ্রবণতাকে মানুষের আধ্যাত্মিক বিকাশের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে হযরত ইউসুফ (আ.) ও তাঁর ভাইদের ঘটনা তুলে ধরে প্রবৃত্তির প্রভাব এবং হিংসার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেন।

তিনি বলেন, মানুষকে কামনা-বাসনা, পদলোভ, ক্ষমতালিপ্সা ও আত্মঅহংকারের ফাঁদ থেকে দূরে থাকতে হবে। নিজের প্রবৃত্তির চাহিদাকে এমন সুযোগ দেওয়া উচিত নয়, যাতে তা তাকে আল্লাহর দাসত্বের পথ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ অনুসরণ থেকে বিচ্যুত করে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha