হাওজা নিউজ এজেন্সি: শিয়া ও সুন্নি উভয় বিশিষ্ট আলেম এবং ঐতিহাসিকদের একটি বড় অংশের দলিলভিত্তিক অভিমত হলো— রাসূলুল্লাহ (সা.) বিষ প্রয়োগের ফলে শাহাদাত লাভ করেছেন। নিচে আমরা প্রথমে শিয়া আলেমদের বক্তব্য এবং পরে সুন্নি সূত্রে উল্লেখিত দলিলগুলো বিশ্লেষণ করব।
শিয়া আলেমদের বর্ণনায় নবীজি’র (সা.) শাহাদাত
শিয়া বিশ্বে স্বনামধন্য ফকিহ ও মুহাদ্দিসগণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, নবী করিম (সা.) ইন্তেকালের সময় বিষপান করেছিলেন এবং শাহাদাত লাভ করেন।
১. শেখ মুফিদ (রহ.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) সোমবার, ২৮ সফরে মদীনায় ইন্তেকাল করেন, যখন তিনি বিষপান করেছিলেন। [১]
২. শেখ তুসি (রহ.) একই বক্তব্য দিয়েছেন এবং তাঁর মতে, নবীজির ইন্তেকালের সময় তিনি বিষক্রিয়ার শিকার ছিলেন। [২]
৩. শেখ তাবারসি (রহ.) বলেন, নবুয়তের মর্যাদার পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ (সা.) শাহাদাতের মহান সৌভাগ্যেও ধন্য হয়েছেন। [৩]
৪. ইবনে ফাতাল নিশাপুরি (রহ.) উল্লেখ করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) হিজরির ১১ম বছরে ২৮ সফরে, ৬৩ বছর বয়সে, বিষক্রিয়ার ফলে ইন্তেকাল করেন। যদিও কিছু বর্ণনায় রবিউল আউয়াল মাসের কথাও আছে, তবে তাঁর মতে প্রথম বক্তব্যই অধিক গ্রহণযোগ্য। [৪]
৫. আল্লামা হিল্লি (রহ.) বলেন, নবী করিম (সা.) ২৮ সফরে, হিজরির ১০ম বছরে বিষক্রিয়ার প্রভাবে ইন্তেকাল করেন। [৫]
৬. মুহাম্মদ ইবনে আলী আরদেবিলি (রহ.) একইভাবে লিখেছেন এবং নবীজির বয়স ও পারিবারিক পরিচয়ও উল্লেখ করেছেন। [৬]
৭. আল্লামা মাজলিসি (রহ.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) সোমবার, ২৮ সফরে, হিজরির ১০ম বছরে ইন্তেকাল করেন, যখন তিনি বিষপান করেছিলেন। [৭]
সুন্নি সূত্রে নবীজির শাহাদাত
শুধু শিয়া সূত্র নয়, সুন্নি ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিসগণেরও অনেকেই রাসূলুল্লাহর (সা.) বিষক্রিয়াজনিত শাহাদাতের কথা উল্লেখ করেছেন।
১. আল-হাকিম নিশাপুরি (মৃ. ৪০৫ হি.)— আল-মুস্তাদরাক আলা সাহিহাইন, খণ্ড ৩, পৃ. ৬১।
২. আবদুর রাজ্জাক আস-সানআনি (মৃ. ২১১ হি.)— আল-মুসান্নাফ, খণ্ড ৫, পৃ. ২৬৯।
৩. ইবনে সাদ যাহরি (মৃ. ২৩0 হি.)— আত-তাবাকাতুল কুবরা, খণ্ড ২, পৃ. ২০১।
৪. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল— মুসনাদ আহমদ, খণ্ড ১, পৃ. ৪০৮।
৫. ইবনে কাসীর দামেশ্কি (মৃ. ৭৭৪ হি.)— আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৫, পৃ. ২২৭।
৬. জালালুদ্দিন সিয়্যুতি (মৃ. ৯১১ হি.)— আল-হাবি লিল ফাতাওয়া, খণ্ড ২, পৃ. ১৪১।
৭. সহিহ বুখারি, মাকতাবে সালফিয়া খণ্ড ৩, পৃ. ১৮১, “বাব্ মারদুন নাবি ওয়াফাতুহু”।
সহিহ বুখারি’র একটি হাদিসে এসেছে: হযরত আয়েশা বর্ণনা করেন— আমরা নবীজির অসুস্থতার সময় জোর করে তাঁর মুখে ওষুধ ঢুকাই। তিনি ইশারায় বোঝান যে, আমাকে ওষুধ খাওয়িও না। কিন্তু আমরা ভেবেছিলাম অসুস্থরা ওষুধ নিতে চান না। পরে তিনি যখন কিছুটা সুস্থ হলেন, বললেন: আমি কি তোমাদের ওষুধ খাওয়াতে নিষেধ করিনি? এরপর তিনি নির্দেশ দেন: এই ঘরে যারা আছে সবাইকে আমার সামনে ওষুধ খেতে হবে, শুধু আমার চাচা আব্বাস ছাড়া, কারণ তিনি তখন উপস্থিত ছিলেন না।
(সহিহ বুখারি, পৃ. ১০৯২, হাদিস ৪৪৫৮, দার ইবনে কাসীর সংস্করণ)
উপর্যুক্ত দলিলসমূহ থেকে স্পষ্ট হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালকে শুধু স্বাভাবিক ওফাত হিসেবে দেখা ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না। বরং বহু নির্ভরযোগ্য শিয়া ও সুন্নি সূত্রের আলোকেই বলা যায়— নবী করিম (সা.) শত্রুপক্ষের প্রদত্ত বিষের কারণে শাহাদাত লাভ করেছিলেন।
অতএব, নবীজির ইন্তেকালকে ওফাত নয়, বরং শাহাদাত হিসেবে চিহ্নিত করাই সঠিক ও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত অভিমত।
তথ্যসূত্র
১. আল-মুকনা'আ, পৃষ্ঠা ৪৫৬।
২. তাহযীবুল আহকাম ফি শারহ আল-মুকনা'আ, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩।
৩. মাজমাউল বায়ান ফি তাফসির আল-কুরআন, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৫৬।
৪. রাওজাতুল ওয়ায়েযীন ও বসীরাতুল মু'তাঈযীন, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৭১।
৫. তাহরীরুল আহকাম আশ-শারইয়্যা আলা মাযহাব আল-ইমামিয়্যা, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১১৮।
৬. জামিউর রুয়াত ও ইযাহাতুল ইশতিবাহাত আনিত তুরুক ওয়াল আসানীদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৬৩।
৭. মালাযুল আখইয়ার ফি ফাহমে তাহযীবুল আখবার, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১২৫।
আপনার কমেন্ট