হাওজা নিউজ এজেন্সি: জাহেলিয়াত যুগের আরব সমাজ ছিল গোত্রপ্রীতি, অন্তহীন যুদ্ধ-বিগ্রহ, কুসংস্কার ও রাজনৈতিক কাঠামোর অভাবে ভরপুর। প্রতিটি গোত্র নিজেদের স্বার্থেই ব্যস্ত ছিল এবং সর্বোচ্চ পরিচয় মনে করত নিজেদের গোত্রকেই। ফলে এমন সমাজে "উম্মতে ওয়াহিদা" (একক জাতি) গঠন করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
এই সময়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হন এবং তাওহীদ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে সমাজকে গড়ে তুলতে শুরু করেন। নবীজী (সা.) জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও রক্তসম্পর্কের পরিবর্তে তাকওয়া ও নৈতিকতাকে মর্যাদার মানদণ্ড বানান। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে বৈরী গোত্রগুলোও ইসলামের পতাকাতলে এসে নতুন পরিচয়ে, অর্থাৎ উম্মাহ হিসেবে একত্রিত হয়।
মদীনায় সামাজিক চুক্তি
নবীজী (সা.) কেবল বিশ্বাস প্রচার করেননি, বরং সমাজের জন্য ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। মদীনার সনদ (সাহিফা-ই-মদীনা) ছিল ইতিহাসের প্রথম লিখিত সামাজিক চুক্তি, যেখানে মুসলমান, ইহুদি ও অন্যান্য গোত্রকে একটি সম্মিলিত সমাজ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এই চুক্তিতে ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সম্মান এবং বহিরাগত আক্রমণের বিরুদ্ধে একসাথে রক্ষার অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এছাড়াও, নবীজী (সা.) মক্কার কাফেরদের সাথেও "হুদাইবিয়ার সন্ধি" করেন, যা তাঁর চুক্তি পালনের দৃঢ়তার প্রমাণ। এমনকি সবচেয়ে কঠোর শত্রুরাও তাঁর আমানতদারিত্ব ও সততার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য ছিল।
ভ্রাতৃত্বের অঙ্গীকার ও নৈতিক নেতৃত্ব
নবীজী (সা.) মদীনায় মুজাহির (মক্কার অভিবাসী) এবং আনসারদের (মদীনার সহায়ক) মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেন। এর মাধ্যমে গোত্রপ্রীতি ও অহংকার দূর হয় এবং মানুষ তাকওয়া ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে একে অপরের ভাই হয়ে যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল নবীজীর উৎকৃষ্ট নৈতিক চরিত্র। তিনি সাধারণ মানুষের মতো জীবন যাপন করতেন, দাস ও দরিদ্রদের সাথে বসতেন, নিজ হাতে কাজ করতেন। কুরআনে আল্লাহ তাঁকে সম্বোধন করে বলেন: “আর নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের অধিকারী।” (সূরা কলম: ৪)
ক্ষমতায় থেকেও দয়া
মক্কা বিজয়ের সময়, যখন প্রতিশোধের আশঙ্কা প্রবল ছিল, নবীজী (সা.) ঘোষণা করেন: “আজ প্রতিশোধের দিন নয়, আজ রহমত ও ক্ষমার দিন।” তিনি তাঁর প্রতিপক্ষদের মুক্তি দিয়ে দয়া প্রদর্শন করেন। তবে, যেসব ব্যক্তি সমাজের নিরাপত্তা বিনষ্টে ও অস্থিরতা সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল, তাঁদের প্রতি ন্যায়সঙ্গত কঠোরতা অবলম্বন করেন। এভাবে প্রমাণিত হয়—নবীজীর দয়া ও ক্ষমাশীলতা সীমাহীন হলেও, সমাজের স্বার্থ ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে তিনি দৃঢ় অবস্থান নিতেন।
নবীজীর ওফাতের পরেও ঐক্য
হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর ২৩ বছরের সংগ্রামের মাধ্যমে যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তাঁর ওফাতের পরও তা টিকে থাকে। নবীজীর গড়ে তোলা শিক্ষা, নৈতিকতা ও সামাজিক কাঠামো এমন দৃঢ় ছিল যে মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ও নেতৃত্বসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও সমাজ আবার অরাজকতায় ভেঙে পড়েনি।
সমকালীন শিক্ষা
কুরআন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সমস্ত যুগের জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ বলে উল্লেখ করেছে। তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় পারিবারিক, শিক্ষামূলক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে।
আজকের বিশ্ব যখন নৈতিক অবক্ষয়, বিভাজন ও সামাজিক সংকটে নিমজ্জিত, তখন নবীজীর শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়:
মানুষ সম্মানিত ও স্বাধীন, কারো দাস নয়।
▪️ঐক্যের ভিত্তি হওয়া উচিত সাধারণ মূল্যবোধ, কেবল বংশ বা জাতি নয়।
▪️ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও দয়া, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
▪️নবীজীর (সা.) প্রকৃত বার্তা হলো মানবমুক্তি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা।
কুরআন ঘোষণা করে: “যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমাদের এমন কিছুর দিকে আহ্বান করেন যা তোমাদের জীবন দান করে, তখন তোমরা সাড়া দাও।” (সূরা আনফাল: ২৪)
এই জীবন হলো এমন মানবিক ও ঈমানী জীবন, যা মানুষকে কুসংস্কার, ভয় ও দাসত্ব থেকে মুক্ত করে প্রকৃত স্বাধীনতা ও মর্যাদার পথে পরিচালিত করে।
আপনার কমেন্ট