শনিবার ৩০ আগস্ট ২০২৫ - ০৮:৪৬
মসজিদে নববী ও সবুজ গম্বুজের ইতিহাস

মসজিদে নববীর সম্প্রসারণ ইতিহাস এবং রাসূলুল্লাহর ﷺ রওজা মোবারকের উপর নির্মিত সবুজ গম্বুজের ইতিহাস জানা মুসলমানদের জন্য এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবনে সহায়ক।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: কোনো মুসলমান প্রথমবার মক্কার কাবা শরীফ দেখে বিমুগ্ধ না হয়ে থাকতে পারে না। সরল ঘনকাকৃতির এই গঠন আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) ঘর হিসেবে দুনিয়ায় তাঁর মহিমার প্রতীক। এটি প্রত্যেক মুসলমানকে তাঁর আমল (সৎ ও অসৎ উভয়ই) স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রহমত ও ক্ষমা প্রাপ্তির আশা জাগায়—যা- তার পবিত্র গৃহে আগমনের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

যদি কাবার দৃশ্য অন্তরে ভক্তির সঞ্চার করে, তবে মসজিদে নববীর সবুজ গম্বুজের প্রথম দর্শন মুসলমানের অন্তরে ভালোবাসা ও মমতা জাগায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ- এর চিরনিদ্রার স্থান, যার নামে এই মসজিদের নামকরণ—মসজিদে নববী। ইয়াসরিব নামের নগরী রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কা থেকে হিজরত করে এখানে আসার পর ‘মাদীনাতুন নবী’ (নবীর শহর) নামে পরিচিত হয়, যা সংক্ষেপে ‘মাদীনা’ নামে খ্যাত, আর সম্মানার্থে বলা হয় আল-মাদীনা আল-মুনাওয়ারা (আলোকোজ্জ্বল নগরী)।

প্রথম নির্মাণ
রাসূলুল্লাহ ﷺ মদীনায় পৌঁছেই সাহাবায়ে কিরামের সঙ্গে মসজিদ নির্মাণ শুরু করেন। এটি ছিল সাধারণ গঠন—প্রায় ৯৮ ফুট x ১১৫ ফুট আয়তনের। দেয়াল ছিল কাদামাটির, ভিত্তি ছিল পাথরের। ছাদ বানানো হয় খেজুর গাছের কাণ্ড ও ডাল দিয়ে। কেবল একটি অংশে ছাদ ছিল, যাতে সূর্য থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজ হাতে নির্মাণকাজে অংশ নেন। দক্ষিণ পাশে ছিল আহলে সুফ্ফা-র জন্য মাচা, যেখানে বাসহীন দরিদ্র সাহাবীরা থাকতেন।

মসজিদের তিনটি দরজা ছিল— দক্ষিণে বাবুল রাহমাহ (দয়ার দরজা), পশ্চিমে বাবুল জিবরাইল (জিবরাইলের দরজা), পূর্বে বাবুল নিসা (মহিলাদের দরজা)।

প্রথমে কিবলা ছিল বায়তুল মাকদিসের দিকে (উত্তরে)। পরে নির্দেশ অনুসারে কিবলা মক্কার কাবার দিকে (দক্ষিণে) পরিবর্তিত হলে মসজিদের দিকও পাল্টানো হয়।

সম্প্রসারণ ইতিহাস
হিজরতের সাত বছর পর প্রথম সম্প্রসারণ হয়; দেয়ালের উচ্চতা বাড়িয়ে ১১ ফুট করা হয়।

খলিফা হযরত উমর ও উসমানের সময় বড় সম্প্রসারণ হয়। হযরত উসমান খেজুরগাছের স্তম্ভের বদলে পাথরের স্তম্ভ ব্যবহার করেন।

উমাইয়া শাসক আল-ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক (৭০৭ খ্রিস্টাব্দে) পুরো পুরোনো মসজিদ ভেঙে নতুন ও বৃহত্তর মসজিদ নির্মাণ করেন, যাতে রাসূল ﷺ-এর রওজা মোবারকও অন্তর্ভুক্ত হয়।

তাঁর পরিবারের হুজরাগুলোও মসজিদের অন্তর্ভুক্ত হয়। রাসূল ﷺ বলেছেন—মিম্বার ও কবরের মধ্যবর্তী স্থান জান্নাতের একটি বাগান (রিয়াদুল জান্নাহ)—এখানে করা দোয়া কবুল হয়।

আব্বাসীয় শাসক আল-মাহদী (৭৭৫–৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ) মসজিদ আরও বড় করেন, ২০টি নতুন দরজা যোগ করেন। মামলুক সুলতান আল-মানসুর কালাউনে ১২৭৯ সালে রাসূল ﷺ-এর রওজার উপর প্রথমবার কাঠের গম্বুজ নির্মাণ করেন, পরে তা রঙিন করা হয়।

১৪৮১ সালে আগুনে মসজিদের বড় অংশ ও কাঠের গম্বুজ পুড়ে গেলে মিশরের সুলতান কায়তবায় পাথর-ইট দিয়ে নতুন গম্বুজ নির্মাণ করেন এবং সীসার পাত দিয়ে ঢেকে দেন। এ কারণে পরে ওয়াহাবিদের ধ্বংসযজ্ঞেও এটি রক্ষা পায়।

সবুজ গম্বুজের ইতিহাস
মামলুকদের পর অটোমানরা হিজাজের নিয়ন্ত্রণ নেয় (১৫১৭–১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ)। তারা মসজিদে নববী ও রাসূল ﷺ-এর রওজার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করত।

অটোমান সুলতান মাহমুদ  ১৮১৮ সালে রাসূল ﷺ-এর রওজা মোবারকের উপর কায়তবায় নির্মিত গম্বুজের ওপর নতুন গম্বুজ নির্মাণ করেন।

১৮৩৭ সালে প্রথমবার এটি সবুজ রঙে রাঙানো হয়, যা আজও অপরিবর্তিত।

২০০৭ সালে সৌদিরা এটি রূপালি রঙ করার চেষ্টা করলে মদীনার জনগণ প্রবল প্রতিবাদে বাধ্য করে পুনরায় সবুজ রঙ করা হয়।

অটোমান সুলতানরা (বিশেষ করে সুলতান সুলাইমান ও সুলতান আবদুল মাজিদ) মসজিদে নববীর ব্যাপক সম্প্রসারণ করেন, মিহরাব, মিনার ও গম্বুজ নতুন করে নির্মাণ করেন। তাঁরা এতটাই সতর্ক ছিলেন যে, কারিগরদের ওজু অবস্থায় কাজ করতে এবং কাজের সময় কুরআন তিলাওয়াত করতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।

সৌদি/ওয়াহাবি ধ্বংসযজ্ঞ
১৮০৫ সালে ওয়াহাবিরা মদীনা দখল করে জান্নাতুল বাকি ও উহুদের শহীদের কবরের সব গম্বুজ ধ্বংস করে। তারা রাসূল ﷺ-এর গম্বুজ ভেঙেও ফেলত, যদি কায়তবায় সীসার আবরণ না দিতেন। ১৮১৯ সালে তাদের বিতাড়িত করা হলেও ১৯২৫ সালে আবার ফিরে এসে তারা প্রায় সব ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করতে থাকে। ৯০% এর বেশি ইসলামী ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংস করা হয়েছে।

২০১৪ সালে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানায়, সৌদি কর্তৃপক্ষ এমন নথি প্রকাশ করেছে যেখানে বলা হয়েছে—“সবুজ গম্বুজ ভেঙে ফেলা হবে এবং রাসূল ﷺ রওজা মোবারক সমান করা হবে।”

মুসলমানদের জন্য এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস একবার ধ্বংস হলে আর ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই মসজিদে নববী ও সবুজ গম্বুজ সংরক্ষণ করা কেবল আবেগ নয়, বরং ইসলামের ইতিহাস রক্ষার জন্য অপরিহার্য দায়িত্ব।

প্রতিবেদন: উম্মে যাহরা আহমেদ 

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha