হাওজা নিউজ এজেন্সি: হযরত হাসান ইবনে আলী মুজতবা (আ.) ছিলেন আমিরুল মু’মিনীন আলী (আ.) ও সায়্যিদা ফাতিমা যাহরা (সা.)-এর প্রথম সন্তান এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা ﷺ-এর প্রথম নাতি।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, “হাসান” নামটি আল্লাহর ওহির মাধ্যমে নবী ﷺ স্বয়ং নির্বাচন করেন এবং তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তিনি সাত বছর নবীর সান্নিধ্যে ছিলেন এবং বাই‘আতুর রিদওয়ান ও মুবাহিলার ঘটনায় উপস্থিত ছিলেন। নবী ﷺ তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন,
“হে হাসান! সৃষ্টির (চেহারা) ও চরিত্রের (আচরণ) দিক থেকে তুমি আমার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।”
ফজিলত ও মর্যাদা
ইমাম হাসান (আ.) ছিলেন আসহাবে কিসার অন্তর্ভুক্ত, যাদের সম্পর্কে আয়াতুত তাহহীর নাযিল হয়েছে। আবার আয়াতুল ইতআ'ম (খাওয়ানো আয়াত), আয়াতে মুওয়াদ্দাত ও আয়াতে মুবাহিলাও এ পরিবারের মর্যাদার সাক্ষ্য দেয়।
তিনি দু’বার তাঁর সমগ্র সম্পদ আল্লাহর পথে দান করেন এবং তিনবার তাঁর অর্ধেক সম্পদ দান করেন। এজন্য তাঁকে বলা হয় “কারিমে আহলে বাইত”। তিনি ২০ বা ২৫ বার পায়ে হেঁটে হজ সম্পাদন করেছেন।
ইমাম হাসান (আ.)-এর জীবনের ১১টি বিশেষ দিক
১. বংশগত সাদৃশ্য: ইবনে শাহার আশূব একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন যেখানে ইমাম হাসান (আ.) নিজেকে উম্মুল মু’মিনীন খাদিজাতুল কুবরা (সা.আ.)-এর সঙ্গে সবচেয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন,
“আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আলী ইবনে আবি তালিবকে তাঁর দাদা আবু তালিবের পৃষ্ঠে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। হুসাইন (আ.) আমার মাতা ফাতিমা যাহরার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। আর আমি সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ উম্মুল মু’মিনীন খাদিজা কুবরার সঙ্গে।”
২. উম্মতের আস্থা: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জ্যেষ্ঠ নাতি হিসেবে তিনি সবার আস্থাভাজন ছিলেন। খলিফা উমর ইবনে খাত্তাব তাঁকে খলিফা নির্বাচনের ছয় সদস্যবিশিষ্ট শুরার সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর অংশগ্রহণে উসমানের যুগে কিছু যুদ্ধের উল্লেখও পাওয়া যায়। হযরত উসমানের খেলাফতের শেষের দিকে বিদ্রোহ চলাকালে, ইমাম আলীর (আ.) নির্দেশে তিনি খলিফা হযরত উসমানের বাড়ি রক্ষা করেছিলেন।
৩. বীরত্ব: তিনি ছিলেন অসাধারণ যোদ্ধা। ইমাম আলীর (আ.) খেলাফতকালে তিনি কুফায় যান এবং জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধে সেনাপতি ছিলেন। জামালের যুদ্ধে শত্রুপক্ষ যখন হযরত আয়েশার উটকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ চালাচ্ছিল, তখন প্রথমে হযরত মুহাম্মদ হানাফিয়াকে পাঠানো হয়; কিন্তু তিনি শত্রুর ঘের ভেদ করতে না পেরে ফিরে আসেন। ইমাম হাসান (আ.) তখন অগ্রসর হয়ে শত্রুদের কেন্দ্র বিন্দুর মূলোৎপাটন করে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটান। সিফফিনে তিনি ডান দিকের সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেন এবং মালিক আশতার তাঁর অধীনে যুদ্ধ করেন।
৪. খেলাফতকাল: ৪০ হিজরির ২১ রমজান ইমাম আলী (আ.)-এর শাহাদাতের পর ইমাম হাসান (আ.) ৬ থেকে ৮ মাস খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় চল্লিশ হাজার ইরাকবাসী তাঁর প্রতি বায়আত করেন। তবে শামী জনগণ ও মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান তাঁর খেলাফতের বিরোধিতা করে যুদ্ধ ঘোষণা করে। অবশেষে ইসলাম ও মুসকিম উম্মাহর শান্তির জন্য পরিস্থিতি শান্তিচুক্তিতে রূপ নেয় এবং খেলাফত মুয়াবিয়ার হাতে যায়।
৫. মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ: ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) ও মু’আবিয়ার মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে প্রথমে শামী সৈন্যরা পরাজিত হয়। এ পরিস্থিতিতে মু’আবিয়া রাতের অন্ধকারে উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের নিকট বার্তা পাঠাল যে, হাসান ইবনে আলী (আ.) আমার সাথে সন্ধির প্রস্তাব দিয়েছেন এবং খিলাফতের দায়িত্ব আমার হাতে সমর্পণ করবেন। একইসাথে মু’আবিয়া তাকে এক মিলিয়ন দিরহাম দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। লোভে পড়ে উবায়দুল্লাহ তার অবস্থান পরিবর্তন করে মু’আবিয়ার সঙ্গে যোগ দেয়।
এরপর ইমাম হাসান (আ.)-এর সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব ক্বায়েস ইবনে সা’দ গ্রহণ করেন। উবায়দুল্লাহর শামী বাহিনীতে যোগদানের পর মু’আবিয়া মনে করল যে ইমাম হাসান (আ.)-এর সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে গেছে। তাই সে সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণের নির্দেশ দিল। কিন্তু ক্বায়েস ইবনে সা’দের নেতৃত্বে ইমামের সেনারা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলে শামীদের পরাজিত করে।
পরবর্তীতে মু’আবিয়া উবায়দুল্লাহর মতোই ক্বায়েস ইবনে সা’দকেও অর্থ ও প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে নিজের দিকে টানতে চাইল। কিন্তু তার এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয় এবং ক্বায়েস দৃঢ়ভাবে ইমামের পাশে থেকে যান।
৬. অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র: ইয়াকুবি লিখেছেন—মুয়াবিয়া ইমামের কাছে প্রতিনিধি পাঠায়, যারা ফিরে গিয়ে জোরে জোরে ঘোষণা করে: “হাসান ইবনে আলীর মাধ্যমে আল্লাহ মুসলমানদের রক্তরক্ষা করেছেন; তিনি শান্তি মেনে নিয়েছেন।” এ কথা শুনে ইমাম হাসানের (আ.) সেনারা ক্ষিপ্ত হয় এবং ইমামের তাঁবুতে হামলা চালায়। এক খারিজি ইমামকে ছুরি মেরে গুরুতর জখম করে। তাঁকে মাদায়েনে নিয়ে চিকিৎসা করা হয়।
৭. সাথীদের বিশ্বাসঘাতকতা: শেখ মুফিদের মতে, কিছু কুফাবাসী গোপনে মুয়াবিয়াকে চিঠি লিখে ইমাম হাসানকে হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেয়। ইমাম বুঝতে পারেন সীমিত সংখ্যক বিশ্বস্ত সাথী নিয়ে তিনি বিশাল সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করতে পারবেন না। তিনি বলেন,
“আল্লাহর কসম! যদি আমি মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করি, ইরাকবাসী আমাকে তাঁর হাতে সোপর্দ করবে।”
৮. শান্তিচুক্তি: বালাযুরি লিখেছেন—মুয়াবিয়া একটি ফাঁকা পৃষ্ঠা পাঠিয়ে দেন যাতে ইমাম যেকোনো শর্ত লিখতে পারেন। যুদ্ধ ক্লান্ত জনগণও যুদ্ধ না চেয়ে শান্তি কামনা করে। অবশেষে ৪১ হিজরিতে ইমাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন।
৯. চুক্তির শর্তসমূহ: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো ছিল—
▫️মুয়াবিয়া কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী শাসন করবেন।
▫️নিজের পর কাউকে উত্তরসূরি করবেন না।
▫️ইমাম আলী (আ.)-এর ওপর গালিগালাজ নিষিদ্ধ করতে হবে।
▫️শিয়ারা নিরাপদে বসবাস করবে।
১০. শাহাদাত: মুয়াবিয়া বহুবার ইমামকে বিষপ্রয়োগের চেষ্টা চালান। অবশেষে স্ত্রী জায়েদা বিনতে আশআসকে অর্থ ও ইয়াজিদের সঙ্গে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ইমামকে বিষ দিতে বাধ্য করেন। সর্বশেষ বার বিষে তাঁর লিভার ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং তিনি তিন দিনের মধ্যে শাহাদাত বরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)-কে অসিয়ত করেন,
“আমাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পাশে দাফন করবে। কিন্তু যদি বিরোধিতা হয়, তবে এক ফোঁটা রক্ত ঝরাবে না; তখন আমাকে বাকিতে দাফন করবে।”
১১. জানাজার বেদনাময় দৃশ্য: মারওয়ান ইবনে হাকাম ও বনি উমাইয়া ইমাম হাসানকে (আ.) রাসূলুল্লাহর (সা.) পাশে দাফন হতে দেননি। দুঃখজনক হলেও তিক্ত সত্য যে, হযরত আয়েশাও রাসূলুল্লাহ’র (সা.) পাশে ইমাম হাসানের (আ.) সমাহিত করার তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁরা জানাজার দিকে তীর নিক্ষেপ করেন। ইবনে শাহার আশূবের বর্ণনায় বলা হয়, ইমামের দেহ থেকে ৭০টি তীর বের করা হয়েছিল। অবশেষে তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়।
উত্তরাধিকার
ইমাম হাসান (আ.)-এর বক্তব্য ও চিঠিপত্র সংকলিত হয়ে “মুসনাদুল ইমামুল মুজতবা” নামে সংরক্ষিত আছে, যেখানে ১৩৮ জন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে তাঁর হাদিস সংকলিত হয়েছে।
সূত্রসমূহ:
▫️ইরশাদ ও ইখতিসাস, শায়খ মুফিদ (রহ.)
▫️মানাকিব, ইবনে শহর আশূব
▫️বিহারুল আনওয়ার, আল্লামা মাজলিসি
▫️উইকিশিয়া
▫️উইকিফিকহ
আপনার কমেন্ট